ধুনটে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে তাঁত পল্লী

বিজনেসটাইমস২৪.কম
বগুড়া, ১৯ নভেম্বর, ২০১২:

বগুড়ার ধুনটে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে বিলুপ্ত প্রায় তাঁত পল্লীর দৃশ্যপট। তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত গ্রামের অভবী মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আধুনিক পদ্ধতির পাওয়ারলুম (হস্তচালিত তাঁতের যান্ত্রিক রূপ) ব্যবহার করে তারা ব্যবসায় মন্দাভাব দূর করছে। এ পেশায় যাদের লোকসান গুণতে হয়েছে, তারা আজ লাভের হিসেব করছে।

উপজেলার খাদুলী গ্রামের মানুষের মূল পেশাই ছিল তাঁতের কাজ। কিন্তু সুতার মূল্য বৃদ্ধি, রঙের দুষপ্রাপ্যতাসহ বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় ১০ বছর আগে তাঁত পেশা ছেড়ে দিতে হয়। তারা ধরেই নিয়েছিল বাঁচতে হলে বাপ-দাদার ওই পেশা ছাড়তে হবে। কিন্তু পাওয়ারলুম তাদের সেই আশঙ্কা দূর করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে।

খাদুলী ছাড়াও জোলাগাঁতি, ছাতিয়ানী, গোবিন্দপুর, রামপুরা, ধেরুয়াহাটি, পিরহাটি, গোপালনগর, বিশাড়দিয়ার, খাটিয়ামারি, কাশিয়াহাটা, উজালশিং, হোসেনপুর, উলুরচাপড়সহ ৫০টি গ্রামে গড়ে উঠেছে শত শত পাওয়ারলুম (তাঁত) কারখানা।

গ্রামের প্রতিটি বাড়িই একেকটি কারখানা, যেখানে দিনরাত কাজ করছেন গৃহকর্তা থেকে শুরু করে পরিবারের সবাই। কেউ তাঁত টানছেন, কেউ সুতা রং করছেন, কেউ ববিনে সুতা ভরছেন, কেউবা উৎপাদিত সামগ্রী রোদে শুকাচ্ছেন। এখানে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের লুঙ্গি ও শাড়ি। আগে হাতে টানা তাঁতের বদলে এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে যন্ত্র চালিত তাঁত (পাওয়ারলুম মেশিন)।

গ্রামের অবস্থাশালী পরিবারগুলোর বাড়ির আঙিনায় স্থাপন করা হয়েছে তাঁত কারখানা। কাশিয়াহাটা গ্রামের পাওয়ারলুম কারখানার মালিক খোকন জানান, এই পাওয়ারলুম তাঁত শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছে। আগেকার তাঁত মেশিনে কিছু যান্ত্রিক পরিবর্তন এনে সেটাতে বৈদ্যুতিক মোটর লাগিয়ে দিয়েই পাওয়ারলুমে রূপান্তর করা যায়। একটি মেশিনে খরচ পড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এই যন্ত্রে একজন শ্রমিকই অন্তত ২০ জনের সমান কাজ করতে পারেন। তাঁতের বুনন ও জমিন ভালো হওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের বাজারও ভালো। আগে কাপড় নিয়ে হাটে গিয়ে বসে থাকতে হতো। আর এখন পাইকাররা তাঁদের কারখানা থেকে কাপড় কিনে নিয়ে যায়।

সুতার রং কারখানা মালিক আব্দুল আলিম জানান, এখন তাঁত শিল্পের দিন বদলে গেছে। এমন একটা সময় তাঁত শিল্পের চরম দুর্দিন ছিল। এ পেশায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব হয়নি। এখন আর অভাব নেই। যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাঁরা আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। মাত্র আধা ঘণ্টা সময়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এক বান্ডিল সুতা রং করতে পারেন, যার পারিশ্রমিক ৯০ থেকে ৫০০ টাকা। এই সুতা দিয়ে ১০ থেকে ১১টি লুঙ্গি ও পাঁচটি শাড়ি তৈরি করা যায়।

সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামের গৃহবধূ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষ তাঁতে কাপড় তৈরিসহ প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলোতে কাজ করে সংসারে বাড়তি আয় করছে। একেকটি সুতার ডিব্বাকে বলা হয় কোন। এই কোন দিয়ে তারা পাল্লা বানান। পরে টানা দিয়ে পরিষ্কার করার পর শুকিয়ে মাড়, সাকো ও তুঁত দিয়ে সুতা শক্তিশালী করা হয়। এরপর চরকায় তুলে সেই সুতার আবার ছোট ছোট পাল্লা করে ববিনে তোলা হয়। সেখান থেকে ড্রামে। এভাবে একেক জনের দিনে আয় হয় দেড় থেকে দুই’শ টাকা। চান্দাইকোনা বাজারের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী আবুল কাসেম জানান, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে তাঁতের লুঙ্গির যে চাহিদা রয়েছে, এর প্রায় অর্ধেকের বেশি কাপড় এসব গ্রামে তৈরি হয়।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*