ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী গামছা হারিয়ে যেতে বসেছে

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঝালকাঠি, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১২:

ঝালকাঠির তাঁতে বোনা গামছা একসময় খ্যাতি অর্জন করেছিল সারা দেশব্যাপী। জাতীয় পর্যায়ের কিংবা বিদেশি কোন বরেণ্য অতিথি ঝালকাঠি বেড়াতে এলে তাদের হাতে বিশেষ উপহার হিসেবে তুলে দেয়া হতো ঝালকাঠির গামছা। দেবার সময় আত্মশ্লাখা নিয়ে বলা হতো এটা ঝালকাঠির তৈরি গামছা।

কিন্তু সেই হস্তচালিত তাঁতে তৈরি ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী গামছা এখন মার খাচ্ছে বিদ্যুৎচালিত তাঁতে তৈরী গামছার কাছে। দেশের বেশির ভাগ কাপড়ের দোকানে ওইসব বিদ্যুৎ চালিত তাঁতে তৈরী গামছা ঝালকাঠির গামছা বলে চালিয়ে দেয়ায় প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতারা।

ঝালকাঠি শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাসন্ডা নদীর পশ্চিম পাড়ের বাসন্ডা ও ইছানিল গ্রামের শতাধিক পরিবার তাঁতে গামছা বুনে সংসার চালাত। বর্তমানে ২০/২২টি পরিবার ঝালকািঠর গামছার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

অন্য কাজ করতে না পারায় শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তারা রাত দিন পরিশ্রম করে টিকিয়ে রেখেছেন এ শিল্পকে।

ঝালকাঠি পৌরসভার ইছানীল এলাকা আর বাসন্ডা গ্রাম ঘুরলে তাঁতীদের মাক্কুর খুট-খাট মিষ্টি শব্দ কানে ভেসে আসে। একটু উঁকি দিলেই দেখা যাবে প্রায় প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় কিংবা আলাদা ঘরে বসানো কাঠ বাঁশের তৈরী ছোট ছোট তাঁত। এতে তৈরী হচ্ছে নানা ডিজাইনের আর সাইজের গামছা। বাড়ির উঠোনে চরকায় রঙ-বেরঙের সুতা গুটিয়ে-গুছিয়ে দিচ্ছে মহিলা ও শিশুরা। এ দৃশ্য প্রতিদিনকার।

তাঁতীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে ঝালকাঠিতে গামছা তৈরির কাজ চলে আসছে। ষাটোর্ধŸ গনি মিয়া জানান, গামছা তৈরির কাজ বাপ-দাদার পূর্ব পেশা। আমি শিখেছি বাবার কাছে। আমার ছেলে-মেয়েরাও এ গামছা বুনতে পারে। আমাদের গামছার মান অনেক ভাল।

এখানের কারিগররা কোন কিছুতে ফাঁকি দেয় না। প্রতিটি গামছার সূতা, মাপ ও রঙ সঠিকভাবেই দেয়। যে কারণে সারা দেশে এমনকি বিদেশেও এ গামছার কদর আলাদা। তাই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বাইরেও এখানকার গামছা পাওয়া যায়।

গণি মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেশিনে তৈরি গামছা ঝালকাঠির তাঁতে বুনা গামছা বলে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছে। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হয়ে আমাদের তাঁতে বুনা গামছার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়াও তাঁত শিল্পের কাঁচামাল সূতা ও রঙের দাম আকাশচুম্বি। তাই গামছা তৈরির খরচও বেড়ে গেছে। এতে তাঁতীরা খুব একটা লাভ করতে পারছে না।

যুগ যুগ ধরে বাপ-দাদার এ শৈল্পিক পেশা ছেড়ে শত শত কারিগর তাঁত শিল্প বন্ধ করে দিনমজুর, রিকশা, ভ্যান চালনাসহ বিভিন্ন পেশায় চলে গেছে। যারা এখনো এই পেশায় আছেন তারা অন্য কাজ করতে জানেন না।

ঝালকাঠি শহরের নাসির ক্লথ স্টোরের মালিক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ঝালকাঠির গনি মিয়ার তৈরি একখানা বড় গামছার দাম ২৫০ টাকা, একই মাপের একখানা পাবনার বৈদ্যুতিক তাঁতে তৈরি গামছার দাম ২০০ টাকা। এ সুযোগে অনেকে অন্য জেলার গামছায় ঝালকাঠির সিল মেরে বেচাকেনা করছে।

এককালের জৌলুসে ভরা এ শিল্প একাত্তরের পাক হানাদারদের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্বের পূর্বে এসব তাঁতে শাড়ি, ধুতি, শীতচাদর ও গামছা বোনা হতো।

১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকার তাঁতীদের গ্র“পভিত্তিক ঋণ এবং সূতা ও রঙের লাইসেন্স দেয়ার ঘোষণা দিলেও অজ্ঞাত কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এককালে ঝালকাঠি তাঁতীদের নিজ হাতে তৈরি কাপড়ের জন্য সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার শহরের কাপুড়িয়া পট্টিতে বসতো ঐতিহ্যবাহী কাপুড়ের হাট।

এই জমজমাট হাটে সুদূর ঢাকা, চাঁদপুর, গৌরনদী, টরকী, মেদকুল, বরগুনা বেতাগী, পাথর ঘাটা, মোড়েলগঞ্জ, শ্রীরামকাঠি প্রভৃতি স্থান থেকে পাইকার ও বেপারীরা আসতো কাপড় কিনতে। সেই হাটটিও আজ নেই।

এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমজাদ মাস্টার বলেন, এ গামছা শিল্পে স্বর্ণালী দিন ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। আর তা না হলে হয়তো মসলিন কাপড়ের মতো হারিয়ে যাবে ঝালকাঠির গামছা শিল্প। আর ঠাঁই নেবে পাঠ্য বই কিংবা যাদু ঘরের উপকরণ হিসেবে।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*