ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বেতশিল্প

বিজনেসটাইমস২৪.কম
, ১৮ জানুয়ারী, ২০১২:

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি :

বেতশিল্পের স্বর্ণযুগ এখন আর নেই। আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে এ শিল্প এখন অনেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভালো নেই বেতশিল্পীরাও। এ শিল্পে জড়িত সিলেটের প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এখন বেকার হওয়ার উপক্রম। অনেকেই বদলে ফেলছেন তাদের বংশানুক্রমিক এ পেশা।
বেত দিয়ে আসবাব ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে একসময় ভালোই দিন কাটত বেতশিল্পীদের। সেই সোনালি দিন এখন কেবলই স্মৃতি! প্রযুক্তির উন্নয়নে হারাতে বসেছে বেতশিল্পীদের বংশানুক্রমিক এ পেশা। প্লাস্টিক, আয়রন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামশিল্প দখল করে নিয়েছে বেতশিল্পের বাজার। তার ওপর রয়েছে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও মূল্যবৃদ্ধি।

বেতশিল্পের যখন সুদিন ছিল, তখন সিলেট নগরীর ঘাসিটুলায় গড়ে ওঠে ‘বেতপল্লী’। দেশের বেত দিয়ে নির্মিত পণ্যের বেশির ভাগই উৎপাদিত হতো এ পল্লীতে। এ বেতপল্লীতে পাঁচ সহস্রাধিক বেতশিল্পী (স্থানীয় ভাষায় যারা ‘বেতুড়ি’ বলে পরিচিত) বেতের কাজ করতেন। এ ছাড়া সিলেটের বালাগঞ্জ, মৌলভীবাজারের চুনারুঘাট ও সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে আরও পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক বেতশিল্পে জড়িত।
ঘাসিটুলার বেতপল্লী এখনো আছে, আছেন বেতুড়িরাও। তবে বেতের সেই সুদিন আর নেই। নেই আগের মতো বেচাকেনাও। প্রযুক্তির কাছে এ শিল্পটি দিন দিন মার খাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করে ফেলেছেন। যারা এখনো বাপ-দাদার পুরনো পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন, তারাও ভালো নেই। বিকল্প কোনো পেশা খুঁজে না পেয়ে হাল ধরে আছেন পুরনোটির। এ পল্লীতে হাজারখানেক শ্রমিক এখনো পেটের দায়ে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

একসময় বেতুড়িরা এ শিল্পকে নিয়ে গর্ব করতেন। নিজ বংশ ছাড়া ছেলেমেয়েদের বিয়ে-শাদি দিতেন না। তাদের অন্যত্র বিয়ে দিলে বেতের কাজ বাইরের লোক শিখে ফেলবে, এ কারণে এ রীতি প্রচলিত ছিল। এখন আর তা নেই। বেতশিল্পের রুগ্ণ দশায় শিল্পীরাও ভেঙেছেন তাদের পুরনো রীতি। এখন বাইরের লোক কেন, সারা দেশের মানুষ এ কাজ শিখে ফেললেও তাদের কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ যে কাজ করে দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় হয় না, সে কাজ বাইরের লোক শিখলেই কি, আর না শিখলেই কি! সচ্ছল বেতশিল্পীরাও পুরনো পেশা বদল করে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্য পেশায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।
বেতশিল্পের জন্য সারা দেশে, এমনকি বাইরেও সিলেটের আলাদা সুনাম ছিল। সিলেটের শিল্পীদের তৈরি বেতের খাট, সোফা, আলনা, চেয়ার,-টেবিল, টি-টেবিল, টিভি র্যাক, ট্রলি, কর্নার শেলফ, সিডি র্যাক, ওয়াল র্যাক, গ্লাস ফ্রেম, টুল, মোড়া, ইজি চেয়ার ও দোলনাসহ বিভিন্ন আসবাব এবং শৌখিন সামগ্রীর কদর ছিল সবার কাছে। সিলেটের বাইরের কোনো জেলা থেকে কেউ বেড়াতে এলে বেতের কোনো জিনিস না কিনে ফিরেছেন— এমন লোকের সংখ্যা ছিল খুব কম। বিশেষ করে, হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারতে আসা লোকজন ট্রাক ও বাসের ছাদ বোঝাই করে নিয়ে যেতেন এ বেতসামগ্রী।
জেএস কেইন ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল ইসলাম ফখরুল জানান, বেতের বিকল্প বের হয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে রয়েছে এ শিল্প। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে বেতশিল্প পুরোপুরি হারিয়ে যাবে বলে তিনি জানান। কিছু শৌখিন ক্রেতার কারণে তারা এখনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বসতে পারছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফখরুল ইসলাম জানান— আগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের পাইকাররা পণ্য নিতে আসতেন। তাদের পণ্য জোগান দিতেই হিমশিম খেতে হতো। সে সময় মাসে কোটি টাকারও ব্যবসা করেছি। এখন আর সে দিন নেই। সে ব্যবসাও নেই।
তিনি বলেন, সরকার উদ্যোগী হয়ে বেতশিল্প রক্ষায় সহজশর্তে ঋণ দিলে আবার বেতের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।