সাম্প্রদায়িক উসকানির অপরাজনীতি

আদিল আহমেদ
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩:

Adil1দেশের মানুষের এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ধর্মীয় সহিংসতার দিকে যাচ্ছে কিনা । এটা সাড়া দেশের মানুষের আশংকা কিনা বুঝার উপায় নাই, কিন্তু আমাদের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে দেশ এখন পুলসিরাতের উপর দিয়ে হাঁটছে । পার হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ধর্মান্ধতামুক্ত এক সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র । ব্যর্থ হলে ধর্মান্ধতায় উন্মত্ত এক জঙ্গি রাষ্ট্র ।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে পড়েছে আমাদের রাজনীতি । শাহবাগের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সফলতা এটাই । স্বাধীনতার পক্ষে তরুণ প্রজন্মের জাগরণ নাড়া দিয়েছে জাতিকে । স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের রাজনীতিবিদদের দিকশূন্য, লক্ষ্যহীন রাজনীতির অগ্রহণযোগ্যতা অনুধাবনের সুযোগ করে দিয়েছে ।

কিন্তু এই অনুধাবনের সুযোগ না নিয়ে আমাদের কিছু রাজনীতিবিদরা তথা বুদ্ধিজীবীরাও ইতিবাচক এই জাগরণকে কেন্দ্র করে দেশকে ঠেলে দিচ্ছেন একটা সাম্প্রদায়িক বিভেদের দিকে । যে বিভেদ এদেশেকে পরিণত করতে পারে পাকিস্তানের মত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে । যে কোন ধর্মের যে কোন মানুষের সবচেয়ে সংবদনশীল অনুভূতি হচ্ছে তার ধমীয় অনুভূতি । ধর্মের সঙ্গে আবেগ জড়িত, আবেগকে যুক্তি দিয়ে দমানো যায় না ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় হয়তোবা।

এরকম একটা সংবেদনশীল অনুভূতিকে পুঁজি করে কিংবা তা উসকে দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে হবে কেন? রাজনীতিবিদদের রাজনীতি, সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা কিংবা বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি নিশ্চয়ই দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য । আল্লাহ্র প্রদত্ত জ্ঞানের অপব্যবহারও অনৈসলামিক ।

আমরা যদি সরল দৃষ্টিতে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের ছয় দফাকে পর্যালোচনা করি শাহবাগের এই গণজাগরণ ইসলামী মূল্যবোধের বিপক্ষে নয়, নয় তা আস্তিকদের বিরুদ্ধে নাস্তিকদের । এটা মানবতা বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী কিছু লোকের শাস্তির দাবিতে দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন বর্ণের মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন । কোন রাষ্ট্রের কিছু মুসলমান নাগরিক যদি মানবতা বিরোধী কাজ করেন কিংবা খুন হত্যা ধর্ষণ এর মতো অপরাধ করেন, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে তাদের বিচার দাবিতে সবাইকে নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্মাবলম্বী হতে হবে না ।

ভিন্ন ধর্মের অনুসারী কোন নাগরিক কিংবা কোন এক নাস্তিক যিনি কোন ধর্মেই বিশ্বাস করেন না তিনিও ওইসব অপরাধীদের বিচার দাবি করতে পারেন । বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা দলীয় কর্মসূিচর বাইরেও কোন চেতনার পক্ষে বা বিপক্ষে তাদের নিজস্ব অবস্থান নিতে পারে । রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের জন্য রাজনীতি করেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতার জন্য জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় ।

তাই এরকম একটা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকে নিজ দলের পক্ষে নেয়ার জন্য বিভিন্ন দলের চেষ্টা থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক । বহুদলীয় রাজনীতির এগুলোইতো রাজনৈতিক কৌশল । এই ইস্যুতে সরকারি দল যেমন কিছুটা সফল তেমনি স্বাধীনতার ঘোষক দাবিদার দলও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে হরতাল আহ্বানে নৈতিক সমর্থন দিয়ে তাদের পক্ষে রাখার কৌশলে হয়তো সফল। কিšতু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যে আত্মঘাতী অতি পুরনো কৌশল সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় বা জাতিগত বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের ধর্মের প্রতি সহনশীল মানুষকে সহিংস করে উগ্রতা সৃষ্টি করা অবশ্যই কারো কাছে কাম্য হতে পারে না । এ ধরনের অপরাজনীতির পরিণতি আমরা দেখেছি পাকিস্তানে, আফগানিস্তানে ।

আমাদের দেশপ্রেমিক কিছু কিছু রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীর মিডিয়ায় আলোচনা শুনে দু:খ হয়, সংকীর্ন দলীয় আজ্ঞাবহতা প্রমাণের জন্য এই ধরনের বিষবাস্প ছড়িয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে তারা কতটুকু লাভবান হতে পারবেন জানি না তবে এই দেশ যে অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাবে এটা সম্পর্কে তারা কতটুকু ওয়াকিবহাল তারাই জানেন । মানিকগঞ্জের সিংঙ্গাইরের ঘটনা তাদের বিবেককে হয়তো নাড়া দেয় না কি›তু আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে এ এক ভয়ংকর উদ্বেগের বার্তা ।

*মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নহে

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*