অর্থনীতিতে নেই অর্থ, আছে রাজনীতি

পবন আহমেদ
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১০ মার্চ, ২০১৩:

pabanদেশের সর্বক্ষেত্রে ‘নেই’ শব্দটি যুক্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে আরেকটি শব্দ যুক্ত হচ্ছে তা হলো ‘রাজনীতি’। রাজনীতিতে যেমন প্রয়োজন অর্থনীতি- ঠিক তেমনি অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠ রাজনীতি। তবে বর্তমানের রাজনীতি বা গণতন্ত্র হয়ে উঠেছে অর্থের উপর নির্ভর করে। আর এই অর্থের লোভির জন্য জম্ম হয়েছে নতুন এক প্রজম্ম। গত এক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে অর্থনীতির জন্য রাজনীতি হচ্ছে না- রাজনীতি হচ্ছে অর্থের জন্য।

দেশের অর্থনীতি চলে সূচকের উপর, সেই সঙ্গে সূচকের উন্নয়ন হয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে। সেই সূচক এখন নি¤œমুখী। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে দেখা যাবে দেশের তিনটি সূচকই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রেমিটেন্সে চলছে খরা। আর এই সব সূচকের ক্ষেত্রে ‘নেই’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে।

যেমন, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, পানি নেই, পর্যাপ্ত জমি নেই। সেই সঙ্গে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ নেই। নতুন কোনো কর্মসংস্থান নেই। আবার ব্যবসার নিরাপত্তা নেই।

শুক্রবার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রধান শিরোনামে দেখা গেলো ‘চাঁদা না দিলে প্রাণ যাবে’ শীর্ষক এক সংবাদের। একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গেলে তাকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হবে। তাহলে কেনো-ইবা ভ্যাট, ট্যাক্স, আয়কর দিতে হবে সরকারকে।

পত্রিকাটিতে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় স্টল তৈরি করতে হলে আগে চাঁদা দিয়ে তারপর স্টল তৈরি করতে হবে। আর এই চাঁদা সংগ্রহকারীরা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ।

বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী জি.এম কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তিনি নিজে তার অসহায়ত্বের কথা বলেন। তবে তিনি চিঠির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থাকে জানিয়েছেন।

এছাড়া সোঁনালী ব্যাংক ২২ হাজার কোটি টাকার অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় হলমার্ক পক্ষ নিয়ে যে ভাবে রাজনীতির ব্যক্তিরা জড়িয়ে পড়েছেন তাতে করে বোঝা যায় রাজনীতিটা অর্থের জন্য করা হচ্ছে।

আমার লেখায় এ বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। আগেই বলেছি ‘নেই’ ও ‘রাজনীতি’ দুটোই যুক্ত এখন সর্বক্ষেত্রে।

জানুয়ারিতে যে বাণিজ্য মেলা শেরেবাংলা নগরস্থ শুরু হয়েছিল তা শুধু দেশের বাণিজ্যের উন্নয়নে নয়। এ মেলা দেশের ব্যবসাকে বিশ্ববাজারে পরিচিতির একটি উন্মুক্ত দুয়ার। এখানে ৫০৩টি স্টল ও ১৪৩টি প্যাভিলিয়ন ছিল। বিশ্বের ৫৪টি দেশের পণ্যও এসব স্টলে ছিল। তবে কেনো-ইবা রাজনীতির স্বার্থে অর্থনীতির গলাটিপে ধরা হচ্ছে। গুটিকয়েক ব্যক্তির জন্য অর্থনীতি ধ্বংস করা হচ্ছে। কেনো-ইবা রাজনীতির নামে অর্থনীতিকে দুর্বল করা হচ্ছে। কেনো-ইবা রাজনীতির নামে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ব্যাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা খুবই কষ্টকর। আবার কেবা এর উত্তর দিবে। তবে এসব প্রশ্ন সবার কাছেই…?

বর্তমানে রাজনীতি হয়ে উঠেছে হিংসাত্মক। আর অর্থনীতি হয়ে উঠেছে স্রোত। রাজনীতি করা হচ্ছে ক্ষমতা দখলের জন্য। আর অর্থনীতি ব্যক্তিবিশেষের জন্য। মুষ্টিখানিক লোক বর্তমানের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

গত একবছরে দেশের অর্থনীতিতে  যে কালো ছোবল পড়েছে তার বিষ এখনো ব্যাংকি সিক্টের বয়ে যাচ্ছে। ঋণআক্রান্ত হয়ে পড়েছে পুরো ব্যাংকি সেক্টর। অন্যদিকে গত দুই বছর যাবত কালো থাবা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না পুঁজিবাজার। এ বাজারে প্রায় তিন লাখ মানুষ নিংস্ব হয়ে গেছে।  আতাœহুতিও দিয়েছে অনেকে।

দেশে বর্তমানে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এর মূল কারণ প্রশাসন তন্ত্রে কর্মদক্ষতার অভাব। এসব বিষয়গুলো দেশের অর্থনীতির সূচকের মধ্যে পরে। এ সূচকগুলোর মানদণ্ডে সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সুশাসনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বল। আর এসব বিষয়ের জন্যই আমাদের দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হয় না। এবং আমরা দেখেছি যে, বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন (স্টাইলিকেশনস) বাংলাদেশে এসেছে বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে, কিন্তু দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ আক্রমণকারী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর তারা বোধ হয় অনেকটা নিরুতসাহিত হয়েছে। যার ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ছে না।

সবশেষে রয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা ক্রমশই অস্থিরতায় রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিককালে আমরা এ অঙ্গনের বেশ কিছু হিংসাত্মক ঘটনা দেখেছি। আগামী নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে হিংসাত্মক রাজনীতি ততই বাড়তে থাকবে। কাজেই এই যে অনিশ্চয়তা বা অস্থিরতা এটা কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য মোটেই অনুকূল নয়।

সুতরাং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা বেশ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দেশি বিনিয়োগকারীরা যদি বিনিয়োগ না করে বা তাদের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি যদি অত্যন্ত সীমিত থাকে তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও খুব একটা আগ্রহী হয় না। তার কারণ হচ্ছে দেশি বিনিয়োগ যদি বাড়ে তবে বাইরের বিনিয়োগকারীরা মনে করে যে, এ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশটা মোটামুটি বিনিয়োগ অনুকূলে আছে। এবং তারা যদি দেখে নিজেদের দেশের লোকেরাই বিনিয়োগ করছে না, তারা বাহিরের দেশে থেকে কেন বিনিয়োগ করতে আসবে। সেই অবস্থান থেকে প্রতিকূল অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে। এবং অন্যদিকে আমরা যদি আমাদের যে ষষ্ঠ-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করি, সে পরিকল্পনার যে টার্গেটগুলো আছে সেগুলো ৭০ ভাগ বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে বৈদেশিক বিনিয়োগ দেশের অনুকূলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের কাছে থকবে, সেটার পেছনে আর একটা কারণ হচ্ছে যে, বাংলাদেশে একটা নতুন ইয়াং ডায়নামিকের সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই প্রতিকূল প্রকৃতির মতো মিনিমাম একটা বিনিয়োগ দাঁড় করবে। অন্যদিকে আমাদের কৃষক সমাজ তারা অত্যন্ত প্রগ্রেসিভ চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করেন। নতুন কোনো টেকনোলজি ইমপ্রুভ ঘটলে সেটা তারা সহজেই গ্রহণ করে। যেটা তারা একসময় নিতে অনীহা দেখাতো। আজ সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।

কাজেই আমাদের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ থেকে সাড়ে পাঁচ শতাংশ বহাল থাকবে। সেটা অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় খুব একটা খারাপ না। কিন্তু আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সমস্ত টার্গেট আছে, যেমন- দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এই টার্গেটগুলো মিট করার ক্ষেত্রে এটা যথেষ্ট নয়।  এখন আমাদের একটা নতুন অবজেক্ট হলো ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যআয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। সেটা করতে গেলে অন্তত ৮ শতাংশ করাপ্টেট অর্জন করা লাগবে। সেটার সম্ভাবনা যথেষ্ট গ্রীন বলে মনে হচ্ছে না।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যেমন ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ৭ শতাংশ যেটা আমাদের অর্জন হয়েছে ৬.৭ শতাংশ। ৬.৭ শতাংশ নিয়েও কিছুটা প্রশ্ন আছে তবুও আমরা এটাকে ধরে নিচ্ছি০। ২০১২-১৩ অর্থবছরে টার্গেট হচ্ছে ৭.২ শতাংশ। এবং এখন পর্যন্ত যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ৬ শতাংশের বেশি হবে না। এটাকে ব্যাংক ৫.৮  শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল। তবে মোটামুটি ৬ শতাংশের বেশি হবে না এটা একেবারেই নিশ্চিন্তভাবে বলা যেতে পারে।

এবং এর পেছনে একটা কারণ হচ্ছে যে, বিশেষ করে বেসরকারিখাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে বলে মনে হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গিয়ে আমাদের টার্গেট হচ্ছে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। এখন যদি ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হয়, তাহলে আমাদের বিনিয়োগের হার থাকতে হবে কমপক্ষে ৩২ শতাংশ। আর এখন আছে ২৫ শতাংশ। এখন যে ২৫ শতাংশ রয়েছে তার মধ্যে ৩২ শতাংশ বিনিয়োগে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সমষ্টি বিনিয়োগ অর্থৎ সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে। কাজেই এই যে ৬৫ এর প্লান পরিকল্পনার যে প্রবৃদ্ধির টার্গেট সেটাও হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

লেখক : পবন আহমেদ, সাংবাদিক

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*