আমার কী অপরাধ?

আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১৭ মার্চ, ২০১৩:

milonআপনারা সবাই জানেন, ১/ ১১’র সরকারের সময় আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার মামলা বা অভিযোগ ছিল না। সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সব সময় দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো দিন অন্যায় ও দুর্নীতিকে আশ্রয় দেইনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক আক্রোশ চরিতার্থ করতেই আমার প্রতিপক্ষ আমি ও আমার স্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজমুন নাহার বেবী এবং আমার নির্বাচনী এলাকার অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৩১ টি মামলা দায়ের করে। বিনা বিচারে প্রায় দেড় বছর কারাবাসের পর ২০১১ সালে মুক্ত হয়েছি বটে কিন্তু অজানা আশঙ্কায় আমাকে এখনও ফেরারি জীবন কাটাতে হচ্ছে। আমার প্রতিপক্ষের ক্রমাগত হয়রানির ফলে আমার স্ত্রী ও মেয়ে তানজীদা নাহার হক লেখাপড়া বন্ধ করে প্রবাসে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছি আমি, একই সঙ্গে আমার পরিবারকে সমাজে হেয় প্রতিপন্নের নিরন্তর চেষ্টা করা হয়েছে ।

সম্প্রতি মহাজোট সরকার আমাকে ডিজিটাল কায়দায় হয়রানি করছে। আমাকে চতুর্থ বারের মত দুদক তলব করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (বি: অনু ও তদন্ত – ১) শাহীন আরা মমতাজ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আমাকে চলতি বছরের ১৪ মার্চ দুদকের সেগুনবাগিচাস্থ প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে হয়েছে। এবারও অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে বলা হয়েছে- ‘জনাব আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।’

এর আগে, দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান কার্যালয়ের উপ পরিচালক (বি: অনু ও তদন্ত – ১) শাহীন আরা মমতাজ চিঠির মাধ্যমে তলব করলে,  চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি দুদকের কার্যালয়ে হাজির হই। ওই সময় আমার বিরুদ্ধে উপরিউক্ত একই অভিযোগ আনা হয়।

গত ২১ নভেম্বর, ২০১২ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দুদকের একটি সিদ্ধান্ত বিজ্ঞপ্তি আকারে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমি সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও আমার স্ত্রীর সম্পত্তি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগেও দুদক আমার ও আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে। আমাদের দুদক কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয়েছে। ব্যাপক অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে বর্তমান সরকারের আমলেই ২০০৯ সালে আমাদের কোনো অবৈধ সম্পদ নেই বলে দুদক স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেই একই ঘটনায় দুদককে আবার আমাদের কেবল হয়রানি করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সর্বশেষ গত বছরের ৬ ডিসেম্বর দুদকে হাজিরার জন্য পুনরায় আমাকে তলব করা হয়েছিল। যদিও একই ঘটনার দু’বার তদন্ত হতে পারে না। এভাবেই চলছে কেবল হয়রানি।

অন্যায়ভাবে আমার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে। আমার বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আমি জরুরি ভিত্তিতে এমআরপি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করি। মাত্র ০৩ (তিন) দিনের মধ্যে পাসপোর্ট দেয়ার নিয়ম থাকলেও আমার প্রতিপক্ষের নির্দেশে পাসপোর্ট আমার হস্তগত হয়নি। যদিও আমার প্রতিপক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর বলেছিলেন, কারো পাসপোর্ট আটকে রাখা হবে না। ইতোমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে রুল জারি করার পরও আমার পাসপোর্ট দেয়া হয়নি।

শুধু ইভটিজিং ছাড়া আমার বিরুদ্ধে সব রকমের ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এসব ধারায় আমার ৩ বার মৃত্যুদণ্ড- ও ১২৭৯ বছরের কারাভোগের দণ্ডবিধির অভিযোগ আনা হয়।

৭০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ, খুন হতে শুরু করে মোবাইল সেট চুরি, পুকুরের মাটি চুরি, সিকোফাইভ ঘড়ি ছিনতাই, সোনার চেইন, নেকলেস, মানিব্যাগ, গরু চুরি, ফকিরের টাকা ছিনতাই, যার ঘর বাড়ি নেই, উদ্বাস্তু, মাদকাসক্ত, ছাত্রলীগ, যুবলীগ কর্মীর কাছ থেকে ছিনতাই, ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি, চুরি ডাকাতি, গোলাগুলি, হত্যাচেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, এমন কি অন্য জেলায় গিয়ে হুমকি, চাঁদা আদায়, এহেনও অপকর্ম নেই যা আমি ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঘটাইনি।

দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার নির্দেশের পরও চাঁদপুর কোর্টের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আসাদুজ্জামান নূর আমাকে জামিন দিয়েও পরবর্তীতে জামিন বাতিল করেন। দু:খজনক হলেও সত্য, জনাব নূরের কাছে আমার কৌঁঁসুলি কারাগারে ১ম শ্রেণির ডিভিশনের আবেদন করলেও তিনি তা এড়িয়ে যান, যা প্রাক্তন মন্ত্রী বা এমপি হিসেবে আমার অধিকার ছিল।

একটি মামলায় জামিন হওয়ার সাথে সাথেই ফ্যাক্স মারফত কারাগারে বন্দি পরোয়ানা পৌঁছে যেত। যে কোন মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন করলেই সরকারের পক্ষের আইনজীবী রিমান্ডের আবেদন করতেন। রিমান্ডের কার্যপ্রণালী শেষ হবার পরপরই অধিকতর তদন্তের জন্য ফের রিমান্ডের আবেদন করা হত। এভাবেই চলত কালক্ষেপণ। হাইকোর্ট জামিন দেয়ার পরও আদালতকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে, চেম্বার জজের আদালতে মামলার স্টেট অর্ডার করানো হত।

এভাবে একের পর এক মামলা করে আমাকে ৪৪৯ দিন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়। অসুস্থতার জন্য চিকিৎসার আবেদন করার পর শুরু হয় নতুন পদ্ধতিতে নির্যাতন। চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে ভর্তি থাকাবস্থায় আমার এন্ডোসকপি ও কলোন্সকপি করার জন্য ডাক্তার ওষুধ খাইয়ে যখন মলত্যাগ করাতে শুরু করান তখন হাসপাতালের পরিচালক  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদের নির্দেশে আমাকে হাজিরা দেয়ার অজুহাতে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় মধ্যরাতে নিয়ে আবার পরের দিন চাঁদপুর কোর্টে হাজির করা, যা ছিল নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। এমন কি সব মামলায় জামিনের কাগজ হাতে পেলেও কারাবিধি লঙ্ঘন করে ৩ দিন আমাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়।

এক কারাগার হতে আরেক কারাগারে গভীর রাতে কোন কারণ ব্যতিরেকে আমাকে স্থানান্তর করানো হতো। চাঁদপুর, কুমিল্লা, রংপুর, সিলেট, ঢাকা এভাবে স্থানান্তরিত করা হত এবং হাজিরার জন্য চাঁদপুর আনা হতো। এমনও ঘটেছে, চাঁদপুরে হাজিরা দিয়ে মধ্যরাতে কুমিল্লায় এনে প্রত্যুষে রংপুরে যাত্রা করে শেষ রাতে আবার রংপুর কারাগারে পৌঁঁছানো। আবারো রংপুর কারাগার থেকে শেষ রাতেই কুমিল্লা এনে চাঁদপুরে  হাজিরার জন্য নিয়ে যেতো।

আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন পুলিশের সার্বক্ষণিক বেষ্টনীর ভেতরে থেকে এহেন অনৈতিক কাজ কিভাবে করা সম্ভব? তাহলে ধর্ষণের সহায়তা কি পুলিশ করেছে? শুধু কচুয়া থানায় নয়, চাঁদপুর কোর্টেও আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দাখিল হয়নি চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছরের মেয়াদকালে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, কীভাবে আমি এ ধরনের কুকর্ম করে পার পেয়ে গেলাম, যার একটি কীর্তিও বাংলাদেশের তীক্ষ অনুসন্ধানী মিডিয়ার চোখে ধরা পড়েনি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই আমার প্রতিপক্ষের ইঙ্গিতে আমাকে চলতি বছরের ১৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৪ (চার) বার দুদকে তলব করা হয়েছে। গত ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন স্পেশাল টাক্সফোর্স আমি ও আমার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদ বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে দুদক আমাকে ক্লিন সার্টিফিকেট দেয় (স্মারক নং দুদক/০২/০৭/চাঁদপুর/বি:অনু: ও তদন্ত-১/৭৫১৩/১/৬ তারিখ ১১/০৫/২০০৯)।

সময় মত বই বিতরণ, নকল প্রতিরোধ, ঝাটকা নিধন প্রতিরোধ আন্দোলন, শিক্ষক নিবন্ধন হতে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কাজে সারা দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষার মানোন্নয়নে মোটিভেশন সভায় উপস্থিত হওয়া থেকে শুরু করে, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার কারণে, এই ৩১ টি মামলার ঘটনার তারিখে ঘটনাস্থলে না থাকার ডায়েরি প্রশাসনের হাতে থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিকভাবে মামলা দিয়ে একজন সাবেক মন্ত্রীকে জঘন্যভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার পরও মানবাধিকার কমিশন থেকে শুরু করে সরকারি এজেন্সিগুলোর নীরবতার পরও মিডিয়াতে আপনাদের উচ্ছ্বসিত প্রতিবাদী কন্ঠস্বর আমাকে প্রভাবিত করেছে।

আমি শুনেছি দুদক আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে । ১৯৪৭ সালের দুদকের ২ নম্বর ধারার ৫ এর ২ ধারা মোতাবেক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে। দুদক ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় নকল প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমি হেলিকপ্টারযোগে পরিদর্শন করেছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়নি। কিন্তু আমি বলতে চাই হেলিকপ্টারে ভ্রমণ আমি নিজস্ব অর্থায়নে করেছি। নিজের টাকায় ভ্রমণে কারো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয় না বলে আমি জানি। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছি এবং তারা এর সত্যতা যাচাই করেছেন। তারপরেও যদি দুদক আমার বিরুদ্ধে মামলা করে তাহলে  ‘I will be happy’ ।

লেখক: সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*