কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খদ্দর বিশ্বজুড়ে সমাদৃত

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ডেস্ক, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩:

image_71218কুমিল্লার ইতিহাস জুড়ে রয়েছে খাদি। স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে এর গৌরবময় ইতিহাস আজও সমাদৃত।

এশিয়া মহাদেশে খাদির জন্য পুরস্কৃত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে কুমিল্লা জেলা হচ্ছে খাদির জন্য বিখ্যাত। খাদির আদি উত্স কুমিল্লা চান্দিনা উপজেলা, যা আজও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে চলেছে।

শতবর্ষ যাবত্ কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া, কলাগাঁও, কুটুম্বপুর, হারং, বানিয়াচং, ভোমরাকান্দি, বেলাশ্বর, মধ্যমতলা, বাড়েরা, গোবিন্দপুর, ছয়ঘড়িয়া, হাড়িখোলা ও দেবিদ্বার উপজেলাধীন বরকামতা, নবীয়াবাদ, জাফরাবাদ, সাইতলা, ভাকরাবাদ, ভানী গ্রামে চরকায় সুতা কেটে কাঠের তৈরি তাঁতে খট! খট!! শব্দে বুনন করে তৈরি হচ্ছে খাদি কাপড়।

তত্কালীন সময়ে এই কাপড়ের কোন নাম ছিল না। রাঙ্গামাটির কার্পাস তুলায় সুতা কেটে এ কাপড় তৈরি আরম্ভ হয়েছিল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিম্নবর্ণের যোগী সম্প্রদায় এই কাপড় তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিল। ১৯২১ সালে গান্ধীর আহবানে বৃহত্তর ভারতবর্ষে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশিয় ‘মোটা কাপড়, মোটা ভাত’ ব্যবহারের ডাক উঠে।

১৯৩০ সালে কুমিল্লার বরকামতায় (বর্তমানে চান্দিনা) চরকায় কাটা সুতা ও তকলীতে কাপড় তৈরির কাজ চলতো। তত্কালে সেখানে ডায়িং মাস্টার হিসাবে কাজ করতেন চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা শৈলেন্দ্রনাথ গুহ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর কুমিল্লা থেকে খাদি শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করা হলে খাদি শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু ওই বিপর্যয় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

১৯৫২ সালে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ড. আখতার হামিদ খানের চেষ্টায় এবং তত্কালীন গভর্নর ফিরোজ খান নুনের সহযোগিতায় কুমিল্লায় ‘দি খাদি এন্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। শৈলেন্দ্রনাথ গুহ বরকামতার খাদির কারখানাটি ধরে রাখেন। কর্মহীন ব্যক্তিদের খুঁজে এনে তার কারখানায় সুতা কাটা, কাপড় বুনার কাজ দিতেন। সারাদেশে প্রসার ঘটাতে তিনি ঢাকায় ‘প্রবর্তন’ নামে একটি খাদি কাপড় বিক্রির দোকান গড়ে তোলেন।

১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে ধীরে ধীরে খাদি কাপড়ের চাহিদা বাড়তে থাকে। খাদি কাপড় এখন বিভিন্ন রঙে ছাপা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে আছে খাদি খাপড়ের পোশাক। উন্নত দেশে খাদি কাপড়ের তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে।

বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শৈলেন্দ্রনাথ গুহের গ্রামীণ খদ্দর পরিদর্শনে আসেন। ঢাকাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থানে খদ্দরের প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আসেন শৈলেন্দ্রনাথ গুহের কারখানাতে। কিন্তু জীবদ্দশায় ইচ্ছা পূরণ হয়নি তার।

খাদি কাপড়ের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যে ভিন্নতর মাত্রা আছে। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু বস্ত্রনীতির অভাবে অন্যান্য তাঁতশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী খাদি বস্ত্রশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাদি শিল্পের প্রসারে শৈলেন্দ্রনাথ গুহের শ্যালক উপেন্দ্র কুমিল্লায় প্রথম ‘শুদ্ধ খদ্দর ভান্ডার’ নামে খদ্দরের ব্যবসা আরম্ভ করেন। সেখানে তিনি রং ও ছাপার কাজও করতেন। পরে তরুণী মোহন রায়ের ‘খাদি ঘর’ শংকর সাহার ‘খাদি কুটিরশিল্প’, মনমোহন দত্তের ‘বিশুদ্ধ খদ্দর ভান্ডার’, কৃষ্ণ সাহার ‘রাম নারায়ণ খাদি স্টোর’, দীশেন দাসের ‘খাদি ভবন’ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বর্তমানে শুধু কুমিল্লা মহানগরীতেই শতাধিক খদ্দর পোশাকের দোকান গড়ে উঠেছে। মহাসড়কের পাশে অবস্থিত অনেক হোটেলের পাশেও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী খদ্দরের দোকান। কারণ দেশের যে প্রান্ত থেকেই কোন ব্যক্তি বা পরিবার কুমিল্লায় বেড়াতে আসেন বা কুমিল্লায় কিছুক্ষণ অবস্থান নেন তাদের কেউ কুমিল্লা ঐতিহ্য হিসাবে খদ্দরের কোন পোশাক না কিনে যাবেন না এটাই স্বাভাবিক।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*