সোনালী আঁশে নতুন আশা

বিজনেসটাইমস২৪.কম
চাটমোহর (পাবনা), ০২ অক্টোবর, ২০১৩:

Juteপাবনার চাটমোহরে কৃষকদের মাঝে সাড়া ফেলেছে পাটচাষের নতুন পদ্ধতি। এতদিন সনাতন পদ্ধতিতে পাটচাষ করে কৃষকেদের লোকসান গুনতে হয়েছে। সেই পাট কৃষকরা নিড়ানি ছাড়া নতুন পদ্ধতিতে আবাদ করে অনেক লাভবান হয়েছে।

এর ফলে সারাদেশে পাটের আবাদ কমলেও এখানে বাড়ছে। নিড়ানি (সনাতন) পদ্ধতিতে একবিঘা পাট আবাদে খরচ হতো ৬ হাজার ৫০০ টাকা। সেখানে নিড়ানি ছাড়া পদ্ধতিতে মাত্র ১ হাজার ৭৪৫ টাকায় খরচে কৃষক একবিঘা পাটচাষ করতে পারছে। খরচ সাশ্রয় হচ্ছে বিঘায় ৫ হাজর ২৪৫ টাকা।

গত বছর থেকে কৃষকদের মাঝে এই পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সার ব্যবহারে সময় ও তারতম্য এনেই এই সাফল্য মিলেছে পাটচাষে।

পাটের জন্মরহস্য আবিস্কৃত হবার পর সম্ভাবনাময় পাট উৎপাদনে সাশ্রয়ী এই পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছেন কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। যিনি বর্তমানে চাটমোহর উপজেলা কৃষি বিভাগের একজন উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা। নাম মো. আব্দুল খালেক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই তার এই উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাট গবেষনা ইনস্টিটিউট তার এই উদ্ভাবনকে সাধুবাদ জানিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার আশ্বাস দিয়েছে।

চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের কাটেঙ্গা উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম জানান,  সনাতন পদ্ধতিতে প্রতিবিঘা জমিতে চাষ দিয়ে সাড়ে ৭ কেজি ইউরিয়া, ১২ কেজি টিএসপি ও ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করে বীজ বপন করতে হয়। এতে খরচ হয় ৮০০ টাকা।

আবার চারা গজানোর ২৫ দিন পর আগাছা নিড়ানি দিয়ে ফের ১০ কেজি ইউরিয়া দিতে হয়। এতে ১০জন মজুরসহ সার বাবদ খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। ৩৫ দিন পাটের বয়স হলে দ্বিতীয় দফা নিড়ানি দিয়ে ৭-১০ কেজি ইউরিয়া দিতে হয়। এ সময়ও ৭ জন মজুরসহ ইউরিয়া সার বাবদ খরচ হয় প্রায় ২ হাজার টাকা।

পাটের বয়স ৬০ দিন হলে আবার লাগে ২/৩ জন মজুর। এদের দিয়ে চোট পাট বাছাই করে তুলে ফেলতে হয়। সব মিলিয়ে পাট কাটার আগ পর্যন্ত খরচ হয় ৬ হাজার ৫০০ টাকা।

নিড়ানি ছাড়া পাটচাষের উদ্ভাবক আব্দুল খালেক জানান, এই পদ্ধতিতে পাটচাষে জমিতে চাষ দিয়ে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৭ কেজি ইউরিয়া, ৫ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি বা পটাশ, ৫ কেজি জিপসাম ও ১ কেজি দস্তা দিয়ে বীজ বপন করতে হয়। এতে খরচ হয় ৮৪৫ টাকা।

চারা গজানোর পর আবার সাড়ে ৭ কেজি ইউরিয়া ছিটিয়ে দিতে হয়। পাটের বয়স ২৮/৩০ দিন হলে আবার সাড়ে ৭ কেজি ইউরিয়া দিতে হয়। এতে গড়ে আগাছা এক ইঞ্চি হলে পাটের উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটে ৩ ইঞ্চি। ফলে আগাছাগুলো পাটের নীচে পড়ে যায়। এক পর্যায়ে দরকার মতো কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের অভাবে আগাছা মরে যায়। এ পর্যায়ে পাটের বয়স ৩৫/৪০ দিন হয়ে গেলে শুধুমাত্র ২/৩ জন মজুর দিয়ে জমির ছোট পাটগুলো বেছে তুলে ফেলতে হয়।

তিনি হিসাব করে বলেন, এই আবাদ পদ্ধতিতে প্রতিবিঘায় মোট খরচ হয় মাত্র ১ হাজার ৭৪৫ টাকা। কৃষকের উৎপাদন সাশ্রয় হয় ৫ হাজার ২৪৫ টাকা।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর (খামারবাড়ী) পাবনার উপ-পরিচালক এবিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাটমোহরে পাটচাষে নতুন পদ্ধতিটি কৃষকদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সেখানে আগের চেয়ে পাটের আবাদ বেড়ে গেছে। জেলার অন্য এলাকার কৃষকরা আগ্রহ দেখাচ্ছে। উদ্ভাবনটি নিয়ে আরও গবেষনা প্রয়োজন। আমার এরমধ্যেই বিষয়টি পাট গবেষনা ইনস্টিটিউটকে জানিয়েছি। তারা এটিকে সাধুবাদ জানিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষনা করবে বলেছে।

নিড়ানি ছাড়া পাটচাষের প্রবর্তক আব্দুল খালেক ২০০৮ সালে গবেষনা শুরু করেন। আবাদের সনাতন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে পাটের প্রধান খরচ নিড়ানি মজুর বাদ দিয়ে শুধু সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহারে তিনি সফলতা পান।

প্রথম উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের লাঙ্গলমোড়া গ্রামের কৃষক আজমত আলীর একবিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে এই পদ্ধতিতে আবাদ করে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ কমে। পরে তিনি উদ্ভাবনটিকে ‘বিনানিড়ানি’ পদ্ধতি নাম দিয়ে মাঠ পর্যায়ে আরও নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করেন।

২০০৯-১০ সালে তিনি আইপিএম কর্মসূচীর কৃষকদের মাঠস্কুল পর্যায়ে নিয়ে ছড়িয়ে দেন। এই দুই বছর ছাইকোলা ইউনিয়নের ৩০ জন পাটচাষী তার পদ্ধতি অনুসরন করে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে পাটচাষ করে কম খরচের সফলতা পান। এরপরই পদ্ধতিটি উপজেলার অনত্র ছড়িয়ে যায়।

এবার নিড়ানি ছাড়া পাটচাষ করে সফলতা পাওয়া ছাইকোলা উত্তরপাড় গ্রামের পাটচাষী হায়দার আলী জানান, এবার ৩ বিঘাতে এই পদ্ধতিতে পাটচাষ করেছেলেন। ভালো সফলতা পেয়েছেন। খরচ চার ভাগের একভাগ লেগেছে। উৎপাদন পরিমান সনাতন নিয়মের মতোই হয়েছে।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*