শিরোনাম:

মুহিত-বারকাত দ্বন্দ্বে অনেক অস্বচ্ছ বিষয় বেরিয়ে আসছে

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪:

muhitসাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের বইয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন সরকারের আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিতর্কের সূচনা অবশ্য করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত।জাতীয় প্রেস ক্লাবে গত বুধবার জনতা ব্যাংকের পাঁচ বছরের সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি) কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে জনতা ব্যাংকের বিদায়ী চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ‘অর্থমন্ত্রীকে জনতা ব্যাংকের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেন। এর আগে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী জনতা ব্যাংক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন জনতা ব্যাংক ছিল সবচেয়ে ভাল অবস্থানে। কিন্তু বর্তমানে এ ব্যাংকের অনেক অবক্ষয় হয়েছে। এর দায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও নিতে হবে। মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণ অনেক বেড়েছে। প্রায় সব কিছুই খারাপ।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ওই অনুষ্ঠানে বারকাত অর্থমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সমলোচনা করে বলেছিলেন, তিনি ইংরেজির ছাত্র। অর্থনীতির কী বোঝেন? তিনি মানুষকে মানুষ মনে করেন না। এই জন্য তিনি খবিশ ও রাবিশ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেন। তার কাছ থেকে ন্যূনতম শিষ্টাচার, ভদ্রতা আশা করি না।এ ছাড়াও অর্থমন্ত্রীকে স্বাধীনতাবিরোধী এবং ৭১ সালে তিনি কোথায় ছিলেন, জিয়ার আমলে কী করেছেন আর ১/১১ এর সময় তার ভূমিকা কী ছিল— এই বিষয়গুলো জাতির জানা উচিত বলে মন্তব্য করেন আবুল বারকাত।

আবুল বারকাত বলেন, তিনি (অর্থমন্ত্রী) একটি বিশেষ অঞ্চলের লোকদের নিয়োগ, পদোন্নতিতে সবসময় তদবির করেছেন। চলেন আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংকের কথামতো। আমি তার কথায় চেয়ারম্যান হইনি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কথায় চেয়ারম্যান হয়েছি।’

অর্থমন্ত্রী ও জনতা ব্যাংকের বিদায়ী চেয়াম্যানের বিরোধপূর্ণ এ কথাবার্তায় অনেক অস্বচ্ছ বিষয় বেরিয়ে আসছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষত: ব্যাংকের সাধারণ একজন চেয়ারম্যান হয়ে অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যে অনেকে যেমন বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি বিব্রত বোধ করছেন দেশের সুশীল সমাজ।

কারও কারও মতে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আবুল বারকাতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় তিনি এ দুঃসাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু অন্তরালের ঘটনা যা-ই হোক, এটা যে স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের নগ্ন প্রকাশ এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ঘটনা অন্যদেরও উৎসাহিত করবে, যা কি না দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের হুমকি।

জনতা ব্যাংকের ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এমন কারও কারও মতে, বিষোদ্গার করার জন্য তৈরি হয়েই এসেছিলেন বারকাত। যদিও এটি কোনো সংবাদ সম্মেলন ছিল না, তথাপি বক্তব্য রাখার সময় সাংবাদিকদের কাছ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন আহ্বান করেন তিনি।

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত গত পাঁচ বছরে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে বড় ধরনের দুর্নীতি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ এ জন্য অর্থমন্ত্রীকেই দোষারোপ করেছেন।

প্রসঙ্গত, আবুল বারকাত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার শেষ কর্মদিবসে গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাসাবো এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেন যে, সুনামগঞ্জের হাওড়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার জন্য জনতা ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে অর্থ প্রদানের জন্য তাকে চিঠি দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু তিনি সেটা অনুমোদন না করায় ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে অর্থছাড় বন্ধ করে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

পরদিন বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকরা বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে আবুল বারকাতের এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

পরে সাংবাদিকদের পুনঃপুনঃ প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, চিঠি লেখার প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি তিনি সুপারিশ করেছিলেন এমন কোনো রেকর্ডও তার দফতরে নেই।

‘ব্যক্তিগত কোনো কারণে আবুল বারকাত তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছেন কি না’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী তখন বলেছিলেন, না, ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। তবে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে তাকে আর রিনিউ করা হবে না, এটা নিয়ে তার মনে হয়ত কোনো দুঃখ থাকতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগে অনেক ইন্টেলেকচ্যুয়াল জায়ান্ট আছেন যাদের আমাদের দেখতে হয়। কিন্তু কাউকে তো সারাজীবন দেখা সম্ভব নয়। পাঁচ বছর তাকে রাখা হয়েছে, এটা যথেষ্ট।

অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য শোনার পর তার ওপর আরও ক্ষেপে যান বারকাত। জনতা ব্যাংকের পাঁচ বছরের সিএসআর কার্যক্রমের ওপর ব্যাংকের উদ্যোগে প্রকাশিত একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্পর্কে টানা ‘বিষোদ্গার’ করেন তিনি।

বারকাতের ‘বিষোদ্গার’ সম্পর্কে বৃহস্পতিবার সকালে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ‘এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, অর্থমন্ত্রী ও আবুল বারকাতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ কথাবার্তার মাধ্যমে অনেক অসচ্ছ বিষয় বেরিয়ে আসছে। অর্থমন্ত্রী কোন গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে এটা সবাই জানে। আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যে লুটপাট হয়েছে এটাও সত্য। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে লোক নিয়োগ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিএসআর নিয়ে একটা নীতিমালা আছে। সেই নীতিমালার আলোকে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এখনতো ব্যাংকগুলো একটা প্রস্তাব বোর্ডে তুলছে আর নিজেদের মত করে অর্থ অনুমোদন দিচ্ছে। জনতা ব্যাংক বলছে তাদের বাজেট ছিল। তাদের বাজেটা কি যৌক্তিক ছিল? সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালিদ বলেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এই বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে জনতা ব্যাংকের ইমেজ যাতে নষ্ট না হয় সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

অন্যদিকে সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি সিএসআর বুঝি না। এই সব বিষয় নিয়ে কথা বলব না। আমি অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও জনস্বার্থ কীভাবে জিম্মি হয় তার এক বিব্রতকর দৃষ্টান্ত এটি। ঘটনাটি সরকার ও সরকারি দল- উভয়ের জন্য অমর্যাদাজনক।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*