মে দিবস : মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক

বিজনেসটাইমস২৪.কম
, ০১ মে, ২০১২:

সৈকত প্রামানিক
অভিনয়শিল্পী ও সাংবাদিক
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ০১ মে:

পয়লা মে- মহান মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার আদায়ের দিন। শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত হয়ে শ্রমের যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন।

১৮৮৬ সালের ১ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে গিয়ে রাষ্ট্রশক্তির নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। সংগ্রামের সেই স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে সারা পৃথিবীর শ্রমিকরা এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু এত বছর পরও শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিকরা আজও নির্যাতিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শ্রমিক তার অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার। কিন্তু এত সোচ্চার হওয়ার পরও তেমন কোনো অগ্রগতি শ্রমিকের ভাগ্যে জোটেনি। ন্যায্য মজুরি, কার্যক্ষেত্রে নিরাপত্তাসহ আজও তাঁরা অনেক মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির চাকা এখন চালু রেখেছেন মূলত পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকরা। অথচ এই দুই শ্রেণীর শ্রমিকরাই বেশি নির্যাতিত ও অবহেলিত।

নারী ও শিশুশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, গৃহশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালকসহ বহু খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের শ্রমিকের স্বীকৃতি এখন পর্যন্ত মেলেনি।

নারীরা যদি পোশাক তৈরী না করে তাহলে কিভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসবে আর বাণিজ্য ঘাটতি কিভাবে মিটবে? জনগণ কী পরিধান করবে?

কৃষক যদি আর ফসল না ফলায়, ধান উৎপাদন না করে তাহলে আমরা কী খেয়ে বেঁচে থাকব?

নির্মাণ শ্রমিকরা যদি গৃহ বা ভবন নির্মাণ না করে তাহলে মানুষ থাকবে কোথায়?

কলকারখানায় যদি শ্রমিকরা আর কাজ না করে তাহলে কী পরিস্থিতি হবে একবার ভাবুন।

মানুষের প্রয়োজনীয় সব পণ্য এবং সেবার যোগান দেয় শ্রমিক বা শ্রমের সঙ্গে জড়িত মানুষ। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণীর জনগণকে যদি তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে সংঘাত অনিবার্য। শ্রমিক শ্রেণী এমনিতেই গরিব তারপর যদি তাদের ন্যায্য পাওনা না দেয়া হয় তাহলে তারা আরো গরিব হবে। অপরদিকে যারা শ্রমিক শোষণ করছে তাদের সম্পদ বাড়বে। ধনিক শ্রেণী আরো ধনি হবে। এভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়বে। আর বৈষম্য যত বাড়বে সংঘাত তত অনিবার্য হয়ে উঠবে। যে আশঙ্কার দিকে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

যাদের শ্রমে ঘামে সভ্যতা গড়ে উঠেছে তাদের যদি সম্মান না করা হয় এবং যদি ন্যায্য অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে আর শ্রম দেয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষ ক্রমান্বয়ে শ্রম বিমুখ হয়ে উঠবে। আর সেটি হবে ভয়ংকর একটি পরিস্থিতি। শ্রম বিমুখ জাতি কখনো সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।

সরকারসহ দেশের সুশীল সমাজ শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যথেষ্ট উদাসীনতার পরিচয় দেয়। পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টিও চরমভাবে অবহেলিত। অহরহই কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। এব্যাপারে নেই কোনো প্রতিকার।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। সেই তথ্যে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় এক দশকে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৩ গুণ।

বিলসের দেওয়া তথ্য অনুসারে ২০০১ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৩০১ জন, ২০০২ সালে ১৬৮ জন, ২০০৩ সালে ২৫১ জন, ২০০৪ সালে ১৮৮ জন, ২০০৫ সালে ৪৮০ জন, ২০০৭ সালে ৪৬৫ জন, ২০০৮ সালে ৫৪৭ জন, ২০০৯ সালে ৩৭৮ জন এবং ২০১০ সালে ৭০৩ জন।

প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্ঘটনাগুলোর সংবাদ অনেক সময় গণমাধ্যমে আসে না এবং তা সাধারণের গোচরের বাইরেই থেকে যায়। তার মানে নিহত শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বিলসের এই তথ্যের চেয়ে বেশি হবে।

সরকারের কারখানা পরিদর্শকের লোকবল সঙ্কট, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, অবহেলাজনিত কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া, যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ এবং আইনি দুর্বলতা ইত্যাদি কারণে প্রতিবছর নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তাসহ অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে সরকার, বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সকল সেক্টরের মানুষকে। কারণ শ্রমিকরা আলাদা কেউ নয়, তাঁরা এদেশেরই মানুষ তাঁদের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সভ্যতার প্রতিটি অনুষঙ্গকে নিয়েই আমরা সুশীল সমাজ।

যে রাজনীতিবিদরা দেশ পরিচালনা করেন সেই নেতারা আজ চরম হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। বিএনপির নেতা এম ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি এক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে যার জন্য সাধারণ মানুষ বা শ্রমিকরা দায়ী নয়। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক বিশৃংখলার জন্য খেসারত দিতে হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীকে।

এবার মে দিবস উপলক্ষে আসুন সবাই মিলে চেষ্টা করি যাতে তাঁরা তাদের অধিকার ফিরে পায়। আমরা চাই-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক।

Print Friendly

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*