বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ০৬ মে :
অল্প পুঁজি, সময় ও শ্রম এবং কম জায়গায় রেশম চাষ করা যায়। রেশম চাষে পরিশ্রমের চেয়ে লভ্যাংশের পরিমাণ বেশি। এসব কারণে কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃষকরা দিন দিন তামাক চাষ ছেড়ে তুলা ও রেশম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। প্রয়োজনীয় সরকারী ব্যবস্থা আর ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি করা হলে কুষ্টিয়ার রেশম চাষ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় দিন দিন রেশম গুটির উৎপাদন বাড়ছে। এতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অবদান রাখতে পারছেন। সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর, কুমারখালীর উপজেলা আশ্রায়ন প্রকল্প, ভেড়ামারা এবং দৌলতপুর উপজেলার পতিত জমিসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় রেশম চাষ হচ্ছে। সবুজ তুঁত গাছ চাষ ও পলু পোকা পালনকে একত্রে বলা হয় রেশম চাষ।
১৯৭৮ সালের প্রথম দিকে কুষ্টিয়ায় তুঁত চাষ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে জেলার বিভিন্ন এলাকাসহ চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পতিত জমিতে তুঁত চাষের প্রসার ঘটে। বছরে দুই বার তুঁত চাষ করা যায়। চৈত্র থেকে বৈশাখ এবং ভাদ্র ও অগ্রহায়ন মাসে তুঁত গাছ রোপণের সময়। পতিত ও উঁচু জমি তুঁত গাছ চাষের জন্য বেশি উপযোগী। তবে যে কোন জমিতেই তুঁত চাষ করা যায়। একটি তুঁত গাছ ৩৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এক ধরনের প্রজাপতির ডিম থেকে জন্ম নেয়া পলু পোকা। এই পোকা তুঁত গাছে রেশম গুটি তৈরি করে। এ থেকেই রেশমী সূতা প্রস্তুত করা হয়।
কুষ্টিয়া রেশম সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া এলাকায় ২৭৩ জন রেশম চাষী রয়েছেন। ১ জন চাষী ১৫০টি উৎপাদনশীল তুঁত গাছ তৈরি করতে পারেন। তা থেকে ১ হাজার কেজি পাতা উৎপাদন হয়।
রেশম চাষে দিন দিন লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অল্প জায়গা ও কম পরিশ্রমে আয় করে সংসার চালানো যায়। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালানো, পরিবারের চিকিৎসা সব কিছুই চলছে রেশম চাষ করে। ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে সরকারী পতিত জমি শুধু রেশম চাষের জন্য নির্ধারণ করা হলে এ শিল্পের প্রসার ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন কুষ্টিয়ার রেশম চাষীরা।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আব্দালপুর ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের রেশম চাষী আলম মিয়া জানান, আগে ধান, সবজি চাষ করে তার দিন চলতো। তার ফুপু আজ থেকে ৩০ বছর আগে রেশম চাষ শুরু করেন। ফুপুর হাত ধরেই রেশম চাষে এসেছেন তিনি। তিনি গত ২০ বছর ধরে রেশম চাষ করে আসছেন। বসত ভিটা ছাড়া চাষের জন্য তার নিজের কোন জমি নেই। মধুপুর সরকারী ক্যানেল পাড় আর কিছু সরকারী পতিত জমিতে প্রায় ২ হাজার গাছ রয়েছে তার। গেল বছর মাত্র ৫ হাজার টাকা লাভ করেছিল রেশম চাষ করে। এবার সব খরচ বাদ দিয়ে ১৩ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। আগামীতে ৩০ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। দুই মেয়ে এক ছেলের সংসার আলম মিয়ার।
আলম আরও জানান, তার বাড়ির পাশে আমিরুল, মোতালেব, হাজের মিয়াকে তার পলু ঘর ব্যবহার করতে দিয়েছেন। তারাও রেশম চাষে এগিয়ে এসেছে। এবার তাদের ডিম দেবে যাতে তারা নিজেরাই তার মত পলু পালন করতে পারে। রেশম বোর্ড থেকে তাকে নগদ ১০ হাজার টাকা দিয়েছিল সেটি আর ফেরত নেয়নি। ওই টাকা দিয়ে আলম মিয়া পলু পালনের ডালা ও ঘর তৈরি করেছেন। এ ছাড়াও ঋণ পরিশোধ করেছেন তিনি। আলম মনে করেন, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হলে এবং সরকারী পতিত জমিগুলো শুধু রেশম চাষের বরাদ্দ দিলে এলাকায় রেশম চাষে ব্যাপক সাফল্য আসবে।
প্রয়োজনীয় লোকবল আর অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সরকারীভাবে রেশম চাষকে আরও ব্যাপক আকারে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান কুষ্টিয়া রেশম সম্প্রসারণ কর্তৃপক্ষ। কুষ্টিয়া রেশম বোর্ডের সহকারী পরিচালক রাশিদুল হক জানান, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সাথে তদারকি করার প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। ৬টি উপজেলা রয়েছে কুষ্টিয়া এলাকায়। এ ছাড়া মেহেরপুর, রাজবাড়ী জেলা কুষ্টিয়া জোনের আওতায়। দৌলতপুর, ভেড়ামারা, মিরপুর আমলায় মাঠ কর্মি রয়েছে। কুমারখালী ও খোকসা এলাকার তদারকি জেলা অফিস থেকে সরাসরি করা হয়।
তিনি জানান, দৌলতপুরে একটি সিল্ক ফ্যাক্টরী রয়েছে। সেখানে ১ জন রিলার, ১ জন ম্যানেজার ও ২ জন টেকনিশিয়ান রয়েছে। তিনি জানান, সঠিক পরিকল্পনা ও দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে এই অঞ্চলে রেশম চাষ সম্প্রসারণ এবং চাষিদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি শিল্প উপকরণের মধ্যে ডালা, চন্দ্রকী সরবরাহ ও উৎপাদিত রেশম গুটি বাজারজাতকরণে সহযোগিতাও দেয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগকে আরও বৃহৎ আকারে দাঁড় করা হলে কুষ্টিয়ার রেশম চাষ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন।
কুষ্টিয়া জেলার মাটি ও আবহওয়া রেশম চাশের অনকূলে থাকায় বাংলাদেশ রেশম বোর্ড কুষ্টিয়া জেলার রেশম চাশের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তুঁত চাষ রোপণ সহায়তা, পলু পালন সহায়তা, পলু পালনে সরবরাহ ও চাষিদের সুতা চাষের জন্য কর্মসুচী অব্যহত রেখেছে।
প্রয়োজনীয় সরকারী উদ্যোগ আর সহযোগিতা পেলে অল্প সময়ের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার অনেক পরিবার রেশম চাষের মাধ্যমে গুটি উৎপাদন করে নিজেদের উন্নয়নসহ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।




