বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ০৭ মে :
প্রায় এক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জনগণের সঞ্চয় প্রবণতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ার পাশাপাশি একই হারে আয় না বাড়ায় সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ফলে কমতে শুরু করেছে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারি) ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে দুই অংকের মূল্যস্ফীতির হার বিরাজ করছে। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাত্ গত বছর এই সময়ে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগতো তা এখন কিনতে গড়ে ১০৯ টাকা ৯৩ পয়সা ব্যয় করতে হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে খরচ বেড়ে গেলেও এই হারে আয় না বাড়ায় মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের স্বল্পমেয়াদি আমানত (ডিমান্ড ডিপোজিট) ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে স্বল্পমেয়াদি আমানত বেড়েছিল ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি আমানতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো নেই, বিনিয়োগ লাভের মুখ দেখছে না। যখন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয় তখন ব্যবসায়ীরা এ ধরনের আমানত বেশি বেশি রাখে।
তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দীর্ঘমেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময় ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। আর গোটা অর্থবছরে ছিল ২২ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে আমানত কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সামপ্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে গেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির তুলনায় জনগণের আয় না বাড়ায় জাতীয় সঞ্চয় কমে গেছে, কমেছে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি। ড. আহসান বলেন, মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক খাতে বিনিয়োগের রিটার্ন কমে গেছে। ফলে মানুষ রিয়াল এসেটে (স্থায়ী সম্পত্তি) খাতে বিনিয়োগে ঝুঁকেছে। তাছাড়া টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে বিনিয়োগকারীরা টাকা সঞ্চয় করাকে অলাভজনক বিবেচনা করছে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে আমানত প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং সেক্টরে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিল কমে বিনিয়োগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারল্য চাপ তীব্র হয়ে একদিকে বাড়ছে সুদের হার, অন্যদিকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণও মিলছে না। ফলে দেশে বিনিয়োগের উপর বেশ চাপ সৃষ্টি করছে, যা দেশের কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি ও স্থায়ী আমানতের সাথে সাথে পোস্ট অফিস ডিপোজিটও (মূলত গ্রামাঞ্চলে পোস্ট অফিসে রাখা আমানত) কমতে শুরু করেছে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। অর্থাত্ এ বছর পোস্ট অফিস ডিপোজিট কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে আসার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নওশাদ চৌধুরী বলেন, বেশ কিছুদিন থেকেই দেশে মূল্যস্ফীতির হার দুই অংকের ঘরে। তাছাড়া মানুষ আগের তুলনায় বেশি খরচপ্রিয় হচ্ছে। ফলে সঞ্চয় প্রবণতা কিছুটা কমছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা একটি দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। তাদের সঞ্চয়, আয় ও ব্যয় সবই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যত আয় করবে তত তাদের খরচ করার প্রবণতা বাড়বে, যা অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করে তুলতে সাহায্য করবে। সঞ্চয় না হলে বিনিয়োগের পথ সম্প্রসারিত হয় না এবং সুযোগ সৃষ্টি হয় না কর্মসংস্থানের। তাই সঞ্চয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। গত ১৩ মাস ধরে দেশে দুই অংকের মূল্যস্ফীতির হার বিরাজ করছে। অর্থাত্ একই দ্রব্য ও সেবার দাম আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। ফলে জনগণের সঞ্চয় কমছে, কমছে ব্যাংকের আমানত, যা শিল্প পুঁজির বিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ দিয়ে থাকে সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে। তাই শিল্প ঋণের সহজপ্রাপ্যতার জন্য আমানতের ভালো প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।




