শেয়ার বাজার নিয়ে কিছু কথা ও সুপারিশ

বিজনেসটাইমস২৪.কম
, ১৩ জুন, ২০১২:

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১৩ জুন :

শেয়ার বাজার নিয়ে গত এক বছর অনেক কথা, অনেক লেখালেখি, অনেক নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত, অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, মানববন্ধন হয়েছে শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নীতি-নির্ধারক ও বিনিয়োগকারীগণ এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করেছেন। কিন্তু বাজার এখনও স্থিতিশীল অবস্থায় আসেনি। ভবিষ্যতে হয়তো এসইসি গৃহীত পদক্ষেপের কিছু সুফল পাওয়া যাবে। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার সংরক্ষণের বিধি কার্যকর হলে কিছুটা সুফল আসবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে একজন বিনিয়োগকারী অধিকার বা সম্পর্ক হচ্ছে তার বিনিয়োগকৃত কোম্পানির লাভ-ক্ষতির ওপর। সে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাভের ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকারী, তেমনি কোম্পানি লোকসান দিলে তার অংশীদার নিয়োগকারী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের কোম্পানীর লাভের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বছরের পর বছর। বিপুল পরিমাণ অর্থ রিজার্ভ ফাণ্ডে জমা থাকার পরও কর্তৃপক্ষ নির্মমভাবে বিনিয়োগকারীদেরকে অতিসামান্য লভ্যাংশ প্রদান করছে। এটা ভয়ানক অন্যায়।

কিন্তু এ অন্যায় প্রতিরোধের কোন পদক্ষেপ এসইসি গ্রহণ করেনি। তথাকথিত এজিএম বা ইজিএম এ লভ্যাংশ অনুমোদন প্রক্রিয়া এক বিরাট ভণ্ডামি বা সাজানো নাটক ছাড়া আর কিচুই না। কোম্পানির প্রতিবছরের মুনাফা থেকে রিজার্ভ ফাণ্ডে অর্থ রাখার সুস্পষ্ট নীতি থাকা আবশ্যক। একইভাবে পরিশোধিত মূলধনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ রিজার্ভের সুনির্দিষ্ট সিলিং বা পরিমাণ থাকাও দরকার। এ দু’টি কাজ আইন করে করা হলে ভাল কোম্পানীতে বিনিয়োগে যেমন বিনিয়োগকারীগণ আকৃষ্ট হবে তেমনি খারাপ কোম্পানী যারা ভাল লভ্যাংশ দেয় না বা দিতে পারে না সে সব কোম্পানীতে বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে।

এসইসির উচিত বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল গেইন-এ উৎসাহিত না করে লভ্যাংশ গেইন-এ উৎসাহিত ও সহযোগিতা করা। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো যেন রিজার্ভ বাড়ানোতে অতিউৎসাহী না হয়ে বিনিয়োগকারীদের যত বেশি সম্ভব লভ্যাংশ দেয় সেদিক উৎসাহিত প্রয়োজনে বাধ্য করা দরকার। বিনিয়োগকারীগণ মার্জিন ঋণের সুদ মাফ নয়, তারা বিনিয়োগকৃত অর্থের যথাযথ লভ্যাংশ চায়। আর এটা কারো দয়া নয়, অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন ও সোচ্চার হওয়ার দরকার। এসইসি ও কোম্পানিসমূহের এ বিষয়ে সজাগ ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন, আর তা হচ্ছে শেয়ারের শ্রেণী বিভাজন। বিদ্যমান অবস্থায় কোনো কোম্পানি ১০% লভ্যাংশ দিলেই সে কোম্পানী ‘এ’ শ্রেণীর কোম্পানীর মর্যাদা পায়, ৫% লভ্যাংশ দিলে ‘বি’ শ্রেণীর মর্যাদা পায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে একজন বিনিয়োগকারী যিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও), রাইট শেয়ারে প্রিমিয়াম দিয়ে শেয়ার ক্রয় করে থাকেন।

সেকেন্ডারি মার্কেটেও অভিহিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে শেয়ার ক্রয় করে থাকেন সে ক্ষেত্রে যদি বিনিয়োগকারীকে অভিহিত মূল্যের ১০% লভ্যাংশ দেয়া হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রে সে লভ্যাংশ প্রকৃতপক্ষে ১% বা তার কমও হতে পারে। যদি ধরেই নেয়া যায় যে, বিনিয়োগকারী অভিহিত মূল্যেই শেয়ারটি ক্রয় করেছেন (সে সম্ভাবনা খুবই কম) তাহলেও তো কোম্পানি ১০০ টাকা লাভ করে ১০ টাকা বিনিয়োগকারীকে লভ্যাংশ হিসেবে দিলে ওই লভ্যাংশকে ভিক্ষা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? আর এ রূপ ভিক্ষাতুল্য লভ্যাংশ দিয়ে একটি কোম্পানী ‘এ’ শ্রেণীর কোম্পানী হতে পারে তা কোন পাগলে মেনে নিবে? কিন্তু বাস্তবে তাই হচ্ছে বা এসইসি তাই করে রেখেছে। আমার মতে, এ রকম কোম্পানীকে ‘এফ’ অর্থাৎ বা ব্যর্থ কোম্পানী বলা

যেতে পারে, কোনভাবেই তাকে ‘এ’ কোম্পানী বলা যায় না। ‘বি’ শ্রেণীর কোম্পানীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
আমার প্রশ্ন ১০% লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানী যদি ‘এ’ কোম্পানী হয় এবং ৫% লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানী যদি ‘বি’ শ্রেণীর কোম্পানী হয় তাহলে ১০০% বা তারও বেশি লভ্যাংশ যে সব কোম্পানী দেয় তারা কোন শ্রেণীর কোম্পানী হবে? আমার মতে কোম্পানীগুলোকে ৯/১০টি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। ১০% এর কম লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীকে ‘এফ’ বা ‘ফেল’ শ্রেণীভুক্ত করতে হবে এবং ক্রমান্বয়ে অধিক লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীকে উচ্চতর শ্রেণীর মর্যাদা দিতে হবে। এতে কোম্পানীগুলো অধিক লভ্যাংশ দিয়ে স্ব স্ব শ্রেণী উন্নীতকরণের চেষ্টা চালাবে। তাতে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন।

রিজার্ভফাণ্ড সংক্রান্ত সুপারিশ :

১. ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বিবেচনা করে ওইসব কোম্পানীর সর্বাধিক পরিশোধিত মূলধনের ১০০% (সমপরিমাণ) অর্থ রিজার্ভ ফাণ্ডে রাখা যাবে, তার অধিক নয়।
২. ঝুঁকি বিবেচনা করে অন্যান্য কোম্পানীর ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধনের ৯০% থেকে ২৫% পর্যন্ত অর্থ রিজার্ভফাণ্ডে রাখার বিধান জারি করতে হবে।
৩. নতুন কোম্পানী বা যেসব কোম্পানী রিজার্ভের সিলিং-এ পৌঁছেনি তার বার্ষিক সর্বোচ্চ ১০% লভ্যাংশ রিজার্ভফান্ডে রাখতে পারবে, অবশিষ্ট অর্থ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার সংখ্যার ভিত্তিতে বণ্টন করতে হবে।
৪. রিজার্ভের সিলিং এর অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বছরের ৩/৪ কিস্তিতে ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে।
প্রদত্ত লভ্যাংশের ভিত্তিতে কোম্পানীর শ্রেণীবিন্যাস এর সুপারিশ:
বার্ষিক ১০০% এর অধিক লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    এ++
বার্ষিক ৮০% থেকে ১০০ পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানী শ্রেণী হবে     :    এ+
বার্ষিক ৬০% থেকে <৬০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    এ
বার্ষিক ৫০% থেকে <৬০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    বি+
বার্ষিক ৪০% থেকে <৫০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    বি
বার্ষিক ৩০% তেকে <৪০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    সি
বার্ষিক ২০% থেকে <৩০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানী শ্রেণী হবে     :    ডি
বার্ষিক ১০% থেকে <২০% পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানীর শ্রেণী হবে     :    ই
বার্ষিক ১০% এর নিচে লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানী শ্রেণী হবে     :    এফ

অন্যান্য সুপারিশ:
১. কোম্পানীর হিসাব-নিকাশে (বিবিধ খরচসহ) ১০০% স্বচ্ছতা আনতে হবে।
২. রাইট শেয়ার প্রিমিয়াম নেয়া বন্ধ করতে হবে।
৩. সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্যোক্তাদের ন্যায় ২% শেয়ার থাকলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর পরিচালক হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
৪. বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সূচকের সর্বনিম্ন সার্কিট ব্রেকার দেয়া যেতে পারে।

পরিশেষে, একথা বলা যায় যে, বিনিয়োগকারীগণ জেনে শুনে বুঝে ভাল শেয়ারে বিনিয়োগ করবে, ভাল লভ্যাংশ পাওয়ার প্রত্যাশায়। এসইসিকে কোম্পানী ভাল মুনাফা করলে বিনিয়োগকারীকে ভাল লভ্যাংশ পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা ভিক্ষা চায় না; তারা ন্যায্য অধিকার চায়, মুনাফা ১০% নয়, তারা ৯০% পাওয়ার অধিকারী, প্রয়োজনীয় আইনের মাধ্যমে এসইসিকে এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পচা শেয়ারে না বুঝে বা অতিলোভে কেউ বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে, অন্য কাউকে নয়। এসইসি-র কাছে বিনিয়োগকারীদের যুগোযোগী আইন ও নীতিগত সহায়তা ও তার বাস্তবায়ন কাম্য, অন্য কিছু নয়।

সবশেষে একথা বলা যায়, যে ভাল লভ্যাংশভিত্তিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ভাল কোম্পানীতে বিনিয়োগ বাড়বে, পচা বা ব্যবসায় ব্যর্থ কোম্পানীতে বিনিয়োগে অতিলোভী ও অতিচালাক ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন, বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে, গ্যামলারদের দৌরাত্ম্য কমে যাবে, শেয়ার বাজারে তারল্য সংকট থাকবে না, ফলে এ বাজার সম্প্রসারিত হবে। এসইসি অন্ধকারে পথ না খুঁজে উপযুক্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বিনিয়োগকারীগণ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে সুফল পাবেন একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

-মো. জালাল উদ্দিন
প্রফেসর, সমাজকর্ম বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

  1. polu says:

    বেশির ভাগ কথাই অযৌক্তিক । আপনার মত একজন জ্ঞানি মানুষ এমন অযৌক্তিক কথা কিভাবে লিখলেন তা বোঝে পাইনা

  2. dream says:

    appreciated your thinking…

  3. bubham says:

    বেশির ভাগ কথাই অযৌক্তিক । আপনার মত একজন জ্ঞানি মানুষ এমন অযৌক্তিক কথা কিভাবে লিখলেন তা বোঝে পাইনা
    জবাব

  4. raju says:

    thanks for good idea

raju শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

*


*