তারল্য সংকটই পুঁজিবাজারের বড় সমস্যা

বিজনেসটাইমস২৪.কম
, ১৯ জুন, ২০১২:

ভঙ্গুর পুঁজিবাজারে শত প্রতিকূলতার  মধ্যেও  বিনিয়োগকারীদের অবিরাম সেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রাইলিংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড।  দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. এম জহিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে  শেয়ারবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে  লিখেছেন বিজনেসটাইমসের  রিপোর্টার কল্পনা আলম

বিজনেসটাইমস : এখন পুঁজিবাজার আস্থা ফিরে পাচ্ছে না কেন? এর পেছনে কি কারণ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

জহিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক বা ভীতি রয়েছে। তারা ভয় পেয়ে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে আবার বেশি দাম শেয়ার কিনছে।  তাছাড়া মার্কেটের গুজবও সবচেয়ে বড় সমস্যা। মার্কেট যদি গুজবনির্ভর না হতো তবে বাজারে আস্থা ফেরানো সম্ভব হতো।

বিজনেসটাইমস:  বেশ কয়েকদিন ধরে দেখতে পাচ্ছি বাজারে লেনদেন কমে যাচ্ছে এর পেছনে কি কারণ রয়েছে ?

জহিরুল ইসলাম : বাজারে সাধারণত তিন ধরনের বিনিয়োগকারী থাকবে, সাধারণ বিনিয়োগকারী, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় মানের হতে পারে আবার মাঝারি মানের হতে পারে এমনকি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীও হতে পারে। এর বাইরেও কিন্তু বিনিয়োগকারী  আছে যাকে আমরা বলি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। আমরা ২০১০ বা ২০১১ সালে বা তার আগে যা দেখেছিলাম বিনিয়োগকারী যারা ছিলেন তাদের পরিমাণটা অনেক বেশি ছিল। বড় বড় ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট মার্কেটে সম্পৃক্ত ছিল। সেই সম্পৃক্ততা এখন কিন্তু অনেক কমে গেছে। এখন যারা আছেন তাদের উপস্থিতিও আগের থেকে অনেক কমে গেছে। এটা একটা বড় কারণ। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আগের মতো অংশগ্রহণ করতে পারছে না কারণ তাদের পুঁজি আটকা পড়ে আছে। আমাদের পুঁজিবাজার এখন লোননির্ভর হয়ে গেছে।  বাজারে এখনও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোন রয়েছে। এই লোন ‘স্ট্যাগ’ থাকার কারণে বড় বড় ব্যাংক, ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট নতুন কোনো ফান্ড নিয়ে এগিয়ে  আসতে পারছে না। এজন্য আমাদের লেনদেন কমে যাচ্ছে।

বিজনেসটাইমস : অনেকে মনে করেন এমএসএ প্লাসের জন্য মার্কেটে টার্নওভার কমে গেছে আপনি সেটি মনে করেন কিনা ?

জহিরুল ইসলাম : এ বিষয়টাতে আমি আপনার সঙ্গে একমত না। যেহেতু  এটি একটি নতুন সফটওয়্যার, নতুন সফটওয়্যার হলে প্রাথমিকভাবে যখন এটি চালু হবে এতে অভ্যস্ত হতে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা সময় লাগতেই পারে। আমার মনে হয় না যে মার্কেটে টার্নওভার কমে যাওয়ার পেছনে এটি কোনো কারণ। নতুন জিনিসে অভ্যস্ত হতে সবারই একটু সময় লাগে। একটু সময় দিলে হয়ত টার্নওভার আহামরি বাড়বে না।  মূল কথা মার্কেটে টার্নওভার বাড়াতে গেলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বড় বড় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের হাউজেতো কোনো সমস্যা নেই। আমরাতো ঠিকই বিনিয়োগ করতে পারছি। অনেক বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করতে পারছে। তবে এমএসএ সফটওয়্যার কেন দায়ী হবে?

বিজনেসটাইমস : এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে সেগুলো কি যথাযথ মনে করেন ?

জহিরুল ইসলাম : সরকার কিন্তু এই মার্কেট নিয়ে সচেতন। গত বছর আমাদের যে সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল এ বছর কিন্তু তা বহাল আছে। এর পাশাপাশি সরকার আরো কিছু নতুন প্যাকেজ দিয়েছে। আপনি জানেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য কিন্তু সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন।  মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো যেখানে ৪২ শতাংশ কর দিতো সেখানে সরকার পাঁচ শতাংশ কর কমিয়ে দিয়েছে। অপ্রদর্শিত অর্থ ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে।  ইনসেন্টিপ এর দিক থেকে  এটা কিন্তু বেটার। সবদিক থেকে বিবেচনা করে আমি বলব যে, সরকার মার্কেটের দিকে খুব ভালোভাবে দৃষ্টি রেখেছে। সুযোগ-সুবিধা ভালো দিয়েছে। কথা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মার্কেটে আসতে হবে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে।  

বিজনেসটাইমস : পুঁজিবাজারকে আরো গতিশীল  করতে এবং বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফেরাতে কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন ?

জহিরুল ইসলাম : আমিতো বললাম শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীরা কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত নয়। আমাদের যেসব ব্রোকারেজ হাউজ রয়েছে আমরা নিজেরাও কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদেরতো অনেকগুলো ব্রাঞ্চ হাউজ রয়েছে, অনেকগুলো স্টাফ রয়েছে চাইলেই কিন্তু আমাদের ব্রাঞ্চগুলো বন্ধ করে দিতে পারি না। আমাদের স্টাফদের না করে দিতে পারি না। আমাদেরতো একটা মানবিক দায়িত্ব আছে। আমরাও কিন্তু বিপদের সম্মুখীন আছি। যার যে দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ব্রোকারেজ হাউজ হিসেবে আমারও একটি দায়িত্ব আছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যেমন- মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো তারা কিন্তু মার্কেটে এক সময় ভালোভাবে সম্পৃক্ত ছিল।  এখন পুনরায় তাদেরই মার্কেটে আবার এগিয়ে আসতে হবে।

বিজনেসটাইমস : বিনিয়োগকারীদের কি করা উচিত বলে মনে করেন ? বিনিয়োগকারীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি ?

জহিরুল ইসলাম : বিনিয়োগকারীদের প্রতি পরামর্শ একটাই যদি নতুন বিনিয়োগকারী হন তবে দেখে-শুনে বাজারে পা ফেলুন। আমাদের মার্কেটে যে সমস্যাটা  তাহলো আমরা নতুন-পুরাতন যেই বিনিয়োগকারী হই না কেন গুজবে তাল দিয়ে শেয়ার কিনি।  ২০১০ সালের ধসের পরেও আমাদের বিনিয়োগকারীদের শিক্ষা হয়নি। এর আগে ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে যে ধস হয়েছিল তখনও কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কোনো শিক্ষা হয়নি। গুজব থেকে বিনিয়োগকারীদের দূরে থাকতে হবে। তারা আজ পুঁজিবাজারে ইনভেস্ট করবে তা আবার লাভের আশায় চারদিন পরে বিক্রি করে ফেলবে এমন করলেতো হবে না। মনে রাখতে হবে এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।  লস হতেই পারে সেটা বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখতে হবে।

আরেকটা জিনিস হলো পুঁজিবাজার বলতে আমরা বুঝি যাদের পুঁজি আছে। অতিরিক্ত অর্থ আছে যে অর্থ আপনার সংসারের কাজে লাগছে না। এটি কোনো জায়গায় সঞ্চয় করে রেখেছেন। সেই অতিরিক্ত অর্থ যদি আপনার থাকে তাহলে আপনি বিনিয়োগ করতে পারবেন। ধরেন আপনার কাছে এক টাকা আছে আরো পাঁচ টাকা আপনি আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করলেন এমনভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত নয়।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*