বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ০১ জুলাই :
ব্যাংকে আমানতকারীদের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) না থাকলে সঞ্চয়ের সুদের ওপর ১৫ শতাংশ বাড়তি হারে উৎসে কর কেটে রাখার সিদ্ধান্ত চালু হচ্ছে আজ রোববার থেকে।
ব্যাংকে ১ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকলেই এর সুদের ওপর এ বাড়তি কর প্রযোজ্য হবে।
ব্যাংকগুলো দাবি করেছে, এর কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা সঞ্চয় করতে অনীহা প্রকাশ করবে। ফলশ্র“তিতে ব্যাংকে তারল্য সংকট আরও প্রকট হবে।
এছাড়া আমানত সংগ্রহ নিয়ে ব্যাংকখাতে অসম প্রতিযোগিতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও মনে করছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকাররা বলছেন, আমানতের একটি বড় অংশের গ্রাহকেরই ব্যাংকে জমা রয়েছে এক থেকে ৫ লাখ টাকা। আর এসব গ্রাহকের অধিকাংশেরই টিআইএন নম্বর নেই। ফলে আমানতের সুদের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ করায় বিপুল পরিমাণ আমানত অন্যখাতে চলে যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমে যাবে।
জানা গেছে, বর্তমানে ভয়াবহ অর্থ সংকটে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এমনকি গ্রাহকের বড় অংকের অর্থও তাৎক্ষণিক দিতে পারছে না অনেকে। ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো এলসি খুলতে পারছে না কেউ কেউ।
কোনো কোনো ব্যাংক তারল্যের চাহিদা মেটাতে উচ্চ সুদে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানি) থেকে উচ্চ সুদে নগদ টাকা ধার করছে। এতেও চাহিদা মেটাতে না পেরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে রেপো সুবিধা নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ অন্য ব্যাংকের গ্রাহককে বেশি সুদ দিয়ে ভাগিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এতে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যাংকিং খাতের এ পরিস্থিতির জন্য ব্যাংকাররা চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের বেশি মাত্রায় ব্যাংক ঋণ নেওয়াকেই দায়ী করছেন।
কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতে আমানতের একটি বড় অংশ আসে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে। তারা মাসে মাসে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার, ২ হাজার, ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি পরিমাণ অর্থ আমানত রাখেন।
পাঁচ বছর বা ১০ বছর মেয়াদি এ আমানতের মেয়াদ শেষে বেশিরভাগ সঞ্চয়কারীকে ১ লাখ থেকে ২ লাখ বা তারও বেশি টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু গ্রাহকদের এ টাকার সুদ থেকে যদি ১৫ শতাংশ কেটে রাখা হয়, তবে গ্রাহকদের বোঝানো কষ্ট হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের একজন গ্রাহক বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যেকোনো গ্রাহককে সুদ প্রদানকালে সুদগ্রহীতার টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হবে।
যেখানে সুদগ্রহীতাকে সুদ প্রদানকালে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। টিআইএন নম্বর না থাকায় সঞ্চয়কারীকে সঞ্চয়ের খেসারতস্বরূপ আরও ৫ শতাংশ বেশি দিতে হবে। এতে সঞ্চয়কারীরা নিরুৎসাহিত হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, যারা ব্যাংকে টাকা সঞ্চয় করেন, তাদের অধিকাংশ পেনশনভোগী, গৃহবধূ, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ। এদের সঞ্চয় তেমন বেশি নয়।
এমনকি এ ধরনের অধিকাংশ আমানতকারি তাদের আমানতের উপর যে সুদ পেয়ে থাকেন তার পরিমাণ আয়কর দেওয়ার সীমায়ও পৌঁছায় না। এ সঞ্চয়কারীদের আমানতের সুদের ওপর বাড়তি করারোপে ব্যাংকিং খাতে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আরেকজন গ্রাহক বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে করের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে জরিমানা ১৫ শতাংশ করলে কালো টাকার মালিকেরা অসন্তুষ্ট হলেও সাধারণ মানুষেরা উপকৃত হতেন।
এতে মধ্যবিত্তদের ঘাড়ের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপতো না। এদিকে, ব্যাংকে সঞ্চয়খাতে আমানতের সুদের ওপর ১৫ শতাংশ কর বৃদ্ধির ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।
এবিবি জানায়, ব্যাংক সঞ্চয়ের ওপর এ ধরনের করবৃদ্ধি ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরুৎসাহিত তো করবেই, উপরন্তু বর্তমানে যেখানে এমনিতেই ব্যাংক কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সেখানে আমানতকারীরা নিরুৎসাহিত হওয়ার মতো ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংগঠনটি আরও জানায়, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রামাঞ্চলের অধিক সংখ্যক লোককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, সুদের ওপর বাড়তি করারোপ করার কারণে তা বাধাগ্রস্ত হবে।




