বিজনেসটাইমস২৪.কম
হবিগঞ্জ, ১৭ জুলাই :
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুরের ফিল্টার তৈরির কারখানাগুলো। পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে ফিল্টারশিল্পের কথা উল্লেখ থাকলেও কালের বিবর্তনে সে শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। অথচ একটু পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্প থেকে বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
বর্তমানে মাধবপুরে ছোটবড় প্রায় ৩০টি ফিল্টার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো থেকে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার ফিল্টার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়, যা থেকে ২ কোটি টাকা আয় করে প্রতিষ্ঠানগুলো।
পঞ্চাশের দশকে মাধবপুরে হীরা লাল রায় বাণিজ্যিকভাবে ফিল্টার উৎপাদন শুরু করেন। এরপর বাজারজাত শুরু করলে সারা দেশে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। ফিল্টারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হীরা লালের বংশধররা এ ব্যবসার প্রসার ঘটান।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফিল্টারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি নির্মাণ করতে সাদা মোজাইক পাউডার, সাদা সিমেন্ট, কালো সিমেন্ট, নুড়ি পাথর, বালু ও মাটি প্রয়োজন হয়। ফিল্টারে বিশেষ ধরনের একটি ছাঁকনি ব্যবহার হয়। প্রতিদিন একেকটি পরিবার পাঁচটি করে ফিল্টার নির্মাণ করে থাকেন। ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সুনির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে এ ফিল্টার সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি ফিল্টার ২৮০-৩০০ টাকায় পাইকারি দরে বিক্রি হয়। বাজারে এর দাম পড়ে ৫০০ টাকা।
দামে সস্তা ও মানে উন্নত বলে দ্রুত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাহিরেও এ ফিল্টার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাধবপুরে উত্পাদিত ফিল্টার একসময় রফতানি হতো ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। কিন্তু বর্তমানে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি ফিল্টারের জয় জয়কারে মাধবপুরের ঢালাই ফিল্টার বাজার থেকে প্রায় উঠে যেতে বসেছে। এ ছাড়া ফিল্টার তৈরির সামগ্রী সিমেন্ট, বালু, তুষ, মোজাইক পাথর প্রভৃতির দাম বাড়ায় উত্পাদন খরচ বহু গুণে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক ফিল্টার প্রস্তুতকারী ভিন্ন ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছে। দিন দিন একদিকে যেমন কমেছে ফিল্টারের কদর, অন্যদিকে ক্রমেই বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এ ঐতিহ্যবাহী ফিল্টারশিল্প।
একসময় মাধবপুরে হরহামেশাই চোখে পড়ত ফিল্টার কারখানা। এখন সেখানে মাত্র ৩০টি কারখানা কোনো রকমে টিকে আছে। সরেজমিনে দেখা যায়, এসব ফিল্টার কারখানায় কমপক্ষে ৫ শতাধিক লোক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। কিন্তু ফিল্টারের বাজারের এ বেহাল অবস্থা দেখে তাদের অনেকেই আর আগ্রহ পাচ্ছেন না এ শিল্পে কাজ করতে। ফিল্টারসামগ্রীর দামের ঊর্ধ্বগতি এবং ফিল্টারের কদর দিন দিন হ্রাসের কারণে মালিকদের বেশির ভাগই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে যারা এখনো জড়িত রয়েছে, তারাও হিমশিম খাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে ফিল্টার প্রতিষ্ঠানের মালিক খোকন মালাকার জানান, ফিল্টারের উপকরণ সিমেন্ট, বালু, পালিশের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে ব্যবসা চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে ৪০ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মাঝারি আকারের একটি ফিল্টার তৈরি করতে ২৮০-৩০০ টাকা খরচ হয়। অথচ তা বিক্রি হয় মাত্র ৩৩০-৩৫০ টাকায়। এভাবে উপকরণের দাম বাড়তে থাকলে বাপ-দাদার আমলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অচিরেই বন্ধ করে দিতে হবে।
উপজেলা সদরের কাটিয়ারা গ্রামের সুনিল দাসের স্ত্রী সুবর্ণ দাস জানান, ২০ বছর ধরে তারা ফিল্টার তৈরি করে আসছে। বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফিল্টার উত্পাদন অনেক কমিয়ে দিয়েছে তারা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানান, সরকার দেশীয় এ শিল্পকে ধরে রাখার উদ্যোগ নিলে আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠবে মাধবপুরের ঐতিহ্যবাহী ফিল্টারশিল্প। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে রফতানি করেও দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন এবং কিছু বেকারের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
হবিগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী জানান, মাধবপুরের এ ফিল্টার শতভাগ আয়রনমুক্ত। তিনি বলেন, প্লাস্টিক ও স্টিলের তৈরি ফিল্টারের পানিতে কোনো স্বাদ নেই। অথচ মাধবপুরের ফিল্টার শুধু আয়রনমুক্তই করে না, পানির স্বাদও অটুট রাখে। সরকারি অফিস-আদালতে এগুলো ব্যবহারের ব্যবস্থা নিলে শিল্পটি অনেকটা এগিয়ে যাবে।
অভিজ্ঞজনদের মতে, এত কম মূল্যে শতভাগ আয়রনমুক্ত পানির ফিল্টার নির্মাণে সরকারি সহযোগিতা শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে।




