রাজধানীর গণপরিবহন যেন উধাও

বিজনেসটাইমস২৪.কম
, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১২:

মেহেদী হাসান আলবাকার:  

একটি শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পরার সংজ্ঞা কি- তা আমার জানা নেই। কিংবা যাত্রীদের প্রতিদিন গড়ে কত ঘণ্টা করে অপেক্ষা করলে বা প্রতিদিন যানজটে কত ঘণ্টা করে সময় অপচয় হলে বলা যাবে যে শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে তাও আমি জানি না। পৃথিবীর অন্য কোনো ঘনবসতিপূর্ণ শহরও ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়তো আমার এখনো হয়ে ওঠেনি। তবে আমি এতটুকু হলফ করে বলতে পারি রাজধানী ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।

সকালে কিংবা বিকেলে, সন্ধ্যায় এমনকি রাত ১২টায়ও রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, কাকরাইল, পল্টন, শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালী, মিরপুর, খিলক্ষেত, উত্তরা প্রভৃতি এলাকায় দেখা যায় বাসের অপেক্ষায় শত শত মানুষ। বাস নেই। একটা বাস আসামাত্র শত শত মানুষের শুরু হয় বাসে ওঠার অন্যরকম যুদ্ধ। বাসে উঠতে গিয়ে প্রায়ই অনেকের খোয়া যাচ্ছে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ।

বর্তমানে রাজধানীতে যেসব বাস চলছে তার প্রায় সবটিতে সংযোজন করা হয়েছে অতিরিক্ত আসন। ৩০ আসনের মিনিবাসে ৪০ থেকে ৪৫টি এবং ৫২ থেকে ৬০ আসনের বড় বাসে ৭০ থেকে ৮০টি আসন বসানো হয়েছে। ভেতরে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে থাকেন ৪০ থেকে ৫০ জন। গায়ে গা, পায়ের ওপর পা, ছোট্ট হাতলের ওপর অসংখ্য হাত। চালক একবার ব্রেক কষলেই হুমড়ি খেয়ে বাসের ভেতর পড়ে যাচ্ছেন সবাই। আসন পেলেও যন্ত্রণা কম নয়। দুটি আসনের মধ্যে পা মেলার ন্যূনতম জায়গাটুকুও নেই। বয়স্ক, নারী এবং শিশু যাত্রীদের দুর্দশা আরও বেশি। সাধারণত এখন ৯০ শতাংশ বাসেই নারী যাত্রীদের উঠতে বাধা দেয় হেলপাররা। কারণ তারা বাসে উঠতে এবং নামতে সময় নেন বেশি।

তবে আর এ সুযোগটি বেশ ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছেন ট্যাক্সি, অটোরিক্সা ও রিক্সা চালকরা। মিটারে যে কোনো গন্তব্যে যে বাধ্য থাকবেন- এ শর্তে বাড়ানো হয়েছিল ট্যাক্সি ও অটোরিক্সার ভাড়া। কিন্তু মালিক-শ্রমিক কেউ মানেনি সে নিয়ম। যে কোনো গন্তব্যে যেতে কয়েকগুণ ভাড়া হেঁকে বসে থাকছেন তারা।

অনেক মধ্যবিত্তই বাধ্য হয়ে যে করেই হউক একটি গাড়ি কিনছেন। এতে ওই মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শহরের রাস্তায় পরিবহন চাপও বাড়ছে। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে আমার মনে হয় ২০২০ সাল নাগাদ উত্তরা থেকে মতিঝিল আর গাবতলী থেকে সদরঘাট পুরো ঢাকাজুড়েই গাড়ির পেছনে গাড়ি লেগে থাকবে। পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে শহরকে।

কিন্তু আমার কাছে এ সমস্যার সমাধান অসম্ভব বা ব্যায়বহুল বলে মনে হয় না । আমার মাঝে মধ্যেই মনে হয় একটি বাই-সাইকেল কিনি। গ্রামে আমার স্কুল ও কলেজ জীবনের পুরোটা সময়ই আমি সাইকেল চালিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হলো- এ ঢাকা শহরে আমি সাইকেল চালাবো কোথায়। এখানে যে সাইকেলের জন্য আলাদা কোনো লেনের ব্যবস্থা নেই। অথচ উন্নয়নশীল দেশ ও এর জনগণের জন্য বাই-সাইকেল খুবই ভালো বাহন । এতে নেই কোনো জ্বালানি খরচ, দামও সব শ্রেণীর মানুষের নাগালের মধ্যেই।

ঢাকার সব বড় রাস্তায় যদি চিকন আইল্যান্ড দিয়ে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করে দেয়া হয় এবং শহরের সব মানুষেরই যদি একটি করে সাইকেল থাকে তাহলে প্রতিদিনই সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণের জ্বালানি। কমবে দেশের আমদানি ব্যয়। শহরের বায়ু দূষণও কমবে। আর ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য যদি অধিকাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে তাহলে রাস্তায় যানবাহনের চাপ অনেক কমে যাবে। ফলে কমবে যানজট।

আর একটু বেশি দূরত্বের জন্য ভালো একটি বাস ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছিল বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রস্তাব ছিল নির্দিষ্ট বাস রুটগুলোতে একটি লেন আইল্যান্ড দিয়ে বাস সর্ভিসের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।  ওই লেনে ওই নির্দিষ্ট রুটের বাস ছাড়া অন্য কোনো গাড়িই চলতে পারবে না। ফলে রাস্তায় যতো জ্যামই থাক না কেন ওই বাসগুলো যথাসময়ই গন্তব্যে পৌঁছাবে।

যেমন মিরপুর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত রুটের কথাই ধরা যাক। এ রুটের একটি লেন আলাদা করে দিতে হবে, যে লেন দিয়ে শুধুমাত্র মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী দ্বিতল বা দুইবগি বিশিষ্ট বড় বাস চলবে। বাসগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বের স্টপেজে এক মিনিট করে শুধু থামবে।

তা হলে ২০ থেকে ২৫ মিনিটির মধ্যেই মিরপুর থেকে মতিঝিলে পৌঁছে যেতে পারবেন যাত্রীরা। আর ওই রুটে ৪০ থেকে ৫০টি এ ধরনের বাস হলেই যথেষ্ট। এভাবে ঢাকা শহরের প্রতিটি রুটের জন্য যদি লেন নির্দিষ্ট করে ৪০ থেকে ৫০টি করে বড় বাস দিয়ে দেয়া হয় তা হলে মাত্র ২ হাজার বাস হলেই ঢাকা শহরের সব মানুষকে যথাসময়ে তার গন্তব্যে পৌঁছার নিশ্চয়তা দেয়া যাবে। এখন যে কয়েক হাজার ছোট-বড় বাস চলছে সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়েই হয়তো এ প্রকল্পের ব্যয় মেটানো সম্ভব।

আরও একটি ভাল উপায়ও আছে। সেটি হলো রেলের ব্যবহার। গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যে রেললাইনটি আছে সেটি ব্যবহার করা হলেই অনেকাংশে কমে যাবে যানজট।

প্রথমেই যেসব সড়কের উপর দিয়ে এই রেললাইন গেছে সেসব ক্রসিংগুলোতে গাড়ি চলাচলের জন্য বক্স কালভার্ট করে ওভার পাসের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কোনো গাড়িই রেল চলাচলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। ফলে কমবে যানজট।

এরপর গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত দুটি আলাদা রেললাইন তৈরি করতে হবে শুধুমাত্র শাটল ট্রেন চলাচলের জন্য। প্রতি ৫ থেকে ১০ মিনিট পর পর ট্রেন থামবে। ১ থেকে ২ কিলোমিটার পর পর থাকবে স্টপেজ। ট্রেনেতো জ্যামে আটকানোর কোনো আশংকা নেই। ফলে এ ট্রেনে চড়তে পারলেই আপনি ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌছে যেতে পারবেন উত্তরা থেকে কমলাপুর।  নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর যাওয়া যাবে ৩০ মিনিটের মধ্যেই।

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিষয়গুলো কি আমাদের মন্ত্রী বা নীতি-নির্ধারকরা জানেন না ? তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেই আমার মনে হয়েছে তারা জানেন। তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন আসবে তারা এগুলো করেন না কেন ? কারণ খুব সোজা। যেখানেই সংকট সেখানেই ভালো ব্যবসা হয়। ঢাকা শহরের এই পরিবহন সংকটকে পুঁজি করেই ব্যবসা করছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। সহজলভ্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হলে তাদের ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে। আর তাই কোনে পরিকল্পনাই ধোপে টিকছে না।

ফলে আমাদের নীতি-নির্ধারক মহল এসব স্বল্পব্যয়ের প্রকল্প সম্পর্কে জানলেও যানজট কমাতে এ ধরণের কোন প্রকল্পই হাতে নেয়া হয়নি। তার বদলে নির্মাণ করা হচ্ছে ব্যয়বহুল ফ্লাইওভার আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন, এসব নির্মাণে যানজট একেবারেই কমবেনা।

এখন প্রশ্ন হলো, সরকার সব জেনেশুনে কেন এসব প্রকল্প হাতে নিল। এখানেও আছে সেই সব সুবিধাভোগী গোষ্ঠির বাণিজ্য। যেসব বড় বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এগুলোর নির্মাণ ব্যয় অনেক। ক্ষমতাসীন দলের নেতার কর্মীরা যারা নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা অনেকেই কাজ পেয়েছেন। তাদের আয় রোজগার হচ্ছে ভাল। হয়তো তাদের সে রোজগার থেকে কিছুটা ভাগ পেয়ে থাকতে পারেন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতাও।

তাহলে এসব সমস্যা থেকে জনগণের মুক্তির পথ কি ? পথ অবশ্যই আছে। ২০২০ সাল নাগাদ ( তার আগেও হাতে পারে) যখন ঢাকা শহরে চিরস্থায়ী জ্যাম বেঁধে যাবে তখন এই পরিবহন এবং নির্মাণ ব্যবসায়ী-চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাবে। আর রোজগার না থাকলে কাউকে ম্যানেজ কারার জন্য অর্থও ব্যয় করতে পারবে না তারা। ফলে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সরকারের সামনেও আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।

আরও একটি উপায় হলো- জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে যখন সর্ব শেষ বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল তখন নারায়ণগঞ্জের জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে ১ টাকা ভাড়া কমাতে বাধ্য হয়েছিল বাস মালিকরা। জনগণের চাপের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। এখন ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সব জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই পিছু হটতে বাধ্য হবে পরিবহন ও নির্মাণ ব্যবসায়ী-চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*