‘ওয়ালটন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আলোকিত করবে’

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২:

বাংলাদেশে একসময় ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। আমদানিকারক দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন রফতানিকারক দেশের কাতারে। আর এ তালিকায় নাম উঠাতে অন্যতম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খ্যাত ওয়ালটন ব্র্যান্ড হিসেবে এখন শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ববাজারেও একটি শক্ত ভিত গড়তে যাচ্ছে। শিগগিরই আরো ৬৫ দেশে ওয়ালটন তাদের পণ্য রপ্তানি করতে যাচ্ছে।  টাটা যেমন ভারতকে সারা বিশ্বে পরিচিত ও মর্যাদার আসনে বসিয়েছে, ওয়ালটন তেমনই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আলোকিত করবে। নানা ধরনের অসম প্রতিযোগিতার মধ্যেও যোগ্যতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে ওয়ালটন।

বিজনেসটাইমসের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কথাগুলো জানিয়েছেন ওয়ালটন কোম্পানির  ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজর এস এম জাহিদ হাসান। তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বিজনেসটাইমস: দেশের ইলেক্ট্রনিক শিল্পে ওয়ালটন কি ভূমিকা রাখছে?

এস এম জাহিদ হাসান : দেশের ইলেক্ট্রনিক শিল্পে ওয়ালটন বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে। আমাদের দেশে ওয়ালটন আসার আগে এই সেক্টরটা পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। আমরাই প্রথমে এই সেক্টরে উৎপাদনের পরিকল্পনা করি এবং বাইরে থেকে সম্পূর্ণ একটি ফ্যাক্টরি এনে স্থাপন করি। আমরাই সর্বপ্রথম উৎপাদনে যাই। আর এখনও পর্যন্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরাই আছি। এখন আমাদের দেখাদেখি দুই-একটি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে, যদিও তারা এখনও পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে উৎপাদনে যেতে পারেনি। আমরা চাই এই সেক্টরে আরো উৎপাদনকারী আসুক, তারা এগিয়ে আসলে এটি একটি শক্তিশালী সেক্টরে পরিণত হবে। বলা যায়, আমরা এখন এই সেক্টরে সংগ্রাম করছি। কারণ এত আমদানিকারীদের ভিড়ে শুধু আমরা একাই উৎপাদন করছি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক খাতে দেশেকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলা।  আর সেটায় আমরা অনেকটাই স্বার্থক। বিদেশ থেকে নি¤œমানের পণ্য আমদানি হওয়ায় আমরা একটি অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছি। আরো যদি বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি হয় তবে আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে বলে আশা করছি। বেশ কয়েকটি নতুন কোম্পানি  এসেছে যারা ইতোমধ্যে ভালোভাবে শুরু করেছে। যদিও আমরা এখন সীমিত আকারে রপ্তানি শুরু করেছি পরে হয়ত আরো বৃহৎ পরিসরে রপ্তানি করা হবে।

বিজনেসটাইমস : দেশীয় শিল্পখাতে ওয়ালটনের অবদান কি?

এস এম জাহিদ হাসান : দেশীয় শিল্পখাতে হয়তো এখনো সে রকম অবদান  রাখতে পারিনি। তবে ইলেক্ট্রিক, ইলেক্ট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল- এ তিন সেক্টরে যদি বলেন তাহলে তো বলবো আমরা একক। অটোমোবাইলে আরো দুই একটি কোম্পানি ইতোমধ্যে বাজারে আসছে যেমন রানার কোম্পানি। তারা বাংলাদেশে মোটর উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া অন্যান্য যেমনÑ রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশন, মোটরসাইকেল এবং টেলিভিশন এইগুলোতেই আমরা আছি । কিন্তু নানা রকম প্রতিকূলতার জন্য আমরা দেশীয় শিল্পখাতে অবদানটা রাখতে পারছি না।

বিজনেসটাইমস : কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ওয়ালটন কি ভূমিকা রাখছে?

এস এম জাহিদ হাসান : এখানে আমি খুব গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ওয়ালটনের ভূমিকা সুদূর প্রসারী এবং ব্যাপক। আর সেটা হলো প্রতোক্ষ এবং পবোক্ষ। প্রতোক্ষটা হলোÑ আমাদের ফ্যাক্টরিতে হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছে। আর পরোক্ষটা হচ্ছে এমন যে, একজন অদক্ষ লোক আমাদের এখানে ছয় মাস বা এক বছর কাজ করলে দক্ষ হয়ে যায়। এছাড়া আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আনার প্রধান উপায় হচ্ছে ফরেন রেমিটেন্স। সেখানে ইলেক্ট্রিক বা ইলেক্ট্রনিক্স খাতে দক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। তাই আমাদের এখানে ছয় মাস বা এক বছর কাজ করার পর কোনো শ্রমিক বা ইঞ্জিনিয়ার দক্ষতা অর্জন করে আমাদের এখানে কাজ না করে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে চলে যায় । আমি দেখেছি অনেকেই আমাদের এখান থেকে কাজ শিখে বিদেশে ভালো সুযোগ পেয়ে চলে যায়। তাছাড়া আমাদের একটি মার্কেট চেইন আছে যার জন্য আমরা গর্ববোধ করি। এই সেক্টর দেশের আর কোথাও নাই। আমাদের নিজস্ব আউটলেট আছে এবং নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউটর আছে। এই দুইটাই আমরা সফলভাবে চালাতে পেরেছি।

বিজনেসটাইমস : বর্তমানে পৃথিবীর কোন কোন দেশে ওয়ালটনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ?

এস এম জাহিদ হাসান : বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ১৭টি দেশে ওয়ালটনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, নেপাল, মায়ানমার, ভারত এবং বেশ কিছু আফ্রিকান দেশ আছে। প্রতিটি দেশে পণ্য রপ্তানি করতে গেলে অনুমোদন লাগে। যেমন ধরেন বাংলাদেশে পণ্য আমদানি করতে গেলে বিএসটিআই’র অনুমোদন লাগে। আমরা আরো ৬৫টি দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য সার্টিফিকেট অনুমোদনের সুপারিশ করেছি। সেই গুলোর বেশির ভাগই সুফলের পথে আছে। কিছুদিনের মধ্যেই সিঙ্গাপুরে আমাদের পণ্য রপ্তানি হবে। সেখানে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটরও নিয়োগ হয়ে গেছে। আমরা আশা করছি এই বছরের মধ্যেই সেখানে রপ্তানির কাজ শুরু করতে পারব।

বিজনেসটাইমস : বাইরের দেশে ওয়ালটন পণ্য কেমন সাড়া ফেলেছে?

এস এম জাহিদ হাসান : হ্যাঁ, বাইরের দেশে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমাদের সাড়া পাওয়ার কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের অধিকাংশ পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে। তবে কিছুদিন যাবৎ সেখানে খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা আর আগের মতো পণ্য দিতে পারছে না। আমরা অন্যদের কাছ থেকে যে রির্পোটগুলো পেয়েছি তা থেকে বোঝা যায় যে, গুণগত দিক হতে আমাদের পণ্য অন্তত চীনের থেকে অনেক ভালো। আমরা মায়ানমার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রেও ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি , আমাদের পণ্য পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই রপ্তানি করতে পারবো।

বিজনেসটাইমস : দেশীয় শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় কি ধরনের বাঁধার সৃষ্টি হচ্ছে?

এস এম জাহিদ হাসান : প্রথমে আমি মনে করি সরকারি নীতি বাঁধার সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদি শিল্পবান্ধব নীতি নেই। দেখা যায় যে, একটা বাজেট আসলেই নীতিমালা একরকম থাকে কিন্তু পরবর্তী বাজেটে সেই নীতিমালা আর থাকে না। ফলে বিনিয়োগকরীরা বিনিয়োগ করে একরকম অস্বস্তিতেই থাকে। কি আসছে পরবর্তী বাজেটে তাদের জানা নেই। তারপর যারা সত্যিকারের বিনিয়োগকারী তাদের ব্যাংক লোন পেতেও অনেক সমস্যা পড়তে হয। তাদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ-গ্যাস আমাদের জাতীয় সমস্যা। উৎপাদনের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা তো বিদ্যুৎ-গ্যাসের উপর নির্ভর না করে আমাদের নিজস্ব জেনারেটর দিয়েই অফিস চালাই। আমাদের বিদ্যুৎ-গ্যাস আছে কিন্তু তা পরিমাণে অনেক কম। তাছাড়া আমাদের  জায়গারও অভাব রয়েছে।

বিজনেসটাইমস : কি ধরনের পদক্ষেপ নিলে দেশীয় শিল্পের আরও বিকাশ ঘটবে বলে আপনি মনে করেন?

এস এম জাহিদ হাসান : সবার আগে চাই সরকারের একটি দীর্ঘ নীতিমালা। যা কমপক্ষে পাঁচ বছর কিংবা দশ বছরের জন্য থাকবে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার জন্য নীতিমালার মধ্যে আইনÑকানুন থাকতে হবে। তাছাড়া বাজেটে আমরা উৎপাদনকারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চাই। অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ দেওয়া দরকার।  আর সরকার যদি নিজের থেকে শিল্প খাতে জায়গা বা প্লট নির্ধারণ করে দেয় তাহলে এখন যে সম্যস্যগুলো বিদ্যমান তা থেকে উত্তরণ করা যাবে।

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*