গলগণ্ড : আয়োডিনেই মিলবে মুক্তি

ডাঃ শাহজাদা সেলিম
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ১৮ অক্টোবর, ২০১২:

মূলত আয়োডিনের অভাবে গলগন্ড বা ঘ্যাগ রোগ হয়। বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাসমূহে আয়োডিনের অভাবজনিত এই রোগের প্রভাব বেশি দেখা যায়।

সমুদ্র থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে এই গলগণ্ড বেশি দেখা যায়। এর কারণ হল, সমুদ্র থেকে যত দূরত্ব বাড়বে মাটিতে তত কম পরিমান আয়োডিন পাওয়া যাবে। আয়োডিনের এ দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে থায়রয়েড গ্রন্থি ক্রমশ বৃহদাকার হতে থাকবে।

সরকারিভাবে খাবার লবনে নির্দিষ্ট মাত্রার আয়োডিন মেশানোর নির্দেশ দেয়া থাকলেও বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো তা মানে না।
পর্যাপ্ত আয়োডিনের ব্যবস্থা করতে পারলেই এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে এই বিপুল জনগোষ্ঠি।

আসুন জেনে নেওয়া যাক এই রোগের কারণ সমূহ ও প্রতিকার………………..

গলগণ্ড বা ঘ্যাগ হল অস্বাভাবিক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত থাইরওয়েড গ্রন্থি। থাইরয়েড গ্রন্থিটি গলার সামনের দিকের নিচের অংশে থাকে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় এটির অবস্থান দৃশ্যমান নয়।

থাইরওয়েড গ্রন্থির আকার অনেকটা প্রজাপতির মতো। দু’পক্ষের দু’টি ডানার মত অংশ (লোব) একটি সংক্ষিপ্ত ও দেহ (ইয়ামাথ) দিয়ে সংযুক্ত থাকে। গ্রন্থিটি যখন আকার-আয়তনে বড় হয় (গলগণ্ড) তখন তা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয় এবং খাবার সময় বা কথা বলার সময় এর নাড়াচাড়া বিশেষভাবে বুঝা যায়।

থাইরয়েড গ্রন্থিটি দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেহে যে ক’টি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি দেহের সামগ্রিক ক্রিয়া কলাপকে প্রভাবিত করে থাইরয়েড তাদের অন্যতম। এটি অন্য অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকেও প্রভাবিত করে। থাইরয়েড গ্রন্থিটি পক্ষান্তরে পিটুইটার (সামনেরটি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা আবার হাইপো থাইরয়েড গ্রন্থির নিয়ন্ত্রণে থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থায়রয়েড হরমোন (টি ৪ ও টি ৩) নিঃসৃত হয়।

থাইরওয়েড গ্রন্থি বিভিন্ন কারণে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল পিটুইটারি গ্রন্থি হতে অধিক কাজ করার নির্দেশ প্রাপ্ত হওয়া। আবার খাদ্যে আয়োডিনের অভাব থাকলেও থাইরয়েড গ্রন্থিটি ক্রমশ বড় হতে থাকবে। এছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থির কিছু কিছু স্থানিক সমস্যার কারণে গ্রন্থিটি ক্রমশই বড় হতে থাকে। এর মধ্যে আছে নড্যুল, ক্যান্সার, হাইপার থায়রয়েজিম ও হাইপো থায়রয়েডজম।

কিছু কিছু ওষুধও থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধির কারন হতে পারে। থাইরয়েড নড্যুল, ক্যান্সার ও হাইপো থায়রয়েডিজম ও হাইপার থায়রয়েডিজমের জন্যও গলগন্ড হতে দেখা যায়।

গলগণ্ডের লক্ষণ সমূহ হঠাৎ করে শুরু হয় না ধীরে ধীরে এই রোগ হতে থাকে। এর প্রধানতম লক্ষণ হল গলার সামনের দিকের মাঝখানের নিচের অংশ বা দু’পাশ ফুলে উঠা। রোগী সাধারণত নিজে থেকে প্রথমে এ সমস্যাটি সনাক্ত করতে পারে না। তার বন্ধুবান্ধব বা ঘনিষ্ঠজন প্রথমে একবার গলার এ স্ফীতিকে সনাক্ত করে। এটি এত ধীরে ধীরে হয় যে, অন্য কেউ বলার পরও রোগী সন্দিহান থাকতে পারে এ ব্যাপারে। কিন্তু তারপর দেখা যাবে এ গ্রন্থিটি ক্রমশ বৃহদাকার হয়ে যাচ্ছে। থায়রয়েড গ্রন্থির বৃদ্দি প্রাপ্তির সাথে সাথে খেতে বা ঢোক গিলতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। গলগন্ড খুব বড় হলে শ্বাস-প্রশ্বাসেও সমস্যা হতে পারে। মেয়েদের ঋতুস্রাবের সময় ও গর্ভাবস্থায় গলগন্ড সাময়িকভাবে আরো বড় হয়।

গলগন্ড হাইপার থাইরয়েডিজমের হলে থাইরয়েড গ্রন্থির নিরসনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ রোগীর কিছু অটোইম্যুন রোগ থাকে যার মধ্যে গ্রেভ’স রোগ প্রধান। এ সব রোগে টিএসএইচ-এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ফলশ্র“তিতে গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে টি৪ ও টি৩ হরমোন নিঃসৃত হতে থাকে। হাইপার থায়রয়েজিমের গলগণ্ডে উপর লক্ষণগুলোর সাথে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, অস্থিরতা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, গরম অসহ্য লাগা, হাত কাপা ও ডায়রিয়া থাকতে পারে।

হাইপো থাইরয়েভিজমের কারণে গলগন্ড হলে থায়রয়েড গ্রন্থির নিঃসরন কমে যায়। ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামলাবার জন্য থায়রয়েড গ্রন্থি আয়তন বাড়তে থাকে। আয়োডিনের স্টাটাড এর প্রধান কারণ। এছাড়া কিছু অটোইম্যুন রোগও এর জন্য দায়ী। এ ক্ষেত্রে গলগন্ডে সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথে শারীরিক দুর্বলতা, অবসাদ, শীত সহ্য করতে না পারা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি থাকতে পারে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সারের জন্যও গলগন্ড দেখা দিতে পারে। এ ক্যান্সার আবার মেয়েদের হবার সম্ভাবনা বেশি। আর যাদের যৌবনের শুরুতে বার বার এক্সরে করতে হয়েছে বা অন্য কোন আনবিক সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের থাইরয়েড ক্যান্সার বেশি হয়। থাইরয়েড ক্যান্সারের হার বরং কম এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ রূপে সেরে যায়। যে কোন বয়সে থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে, যদিও চল্লিশ বছরের কাছাকাছি বয়সের বেশি সংখ্যক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

গলগণ্ড হয়েছে বা হচ্ছে মনে হলেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। আমাদের দেশের অনেকেই এ ব্যাপারটাতে বেশ অনীহা প্রকাশ করেন এবং এর জন্য রোগীকে ও তার পরিবারকে শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হয়। গলগন্ডের সম্ভাব্য রোগীকে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষায়, আলটাসোনগ্রাম থেকে শুরু করে বায়োপথি ও রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন আপটেক  পরীক্ষা পর্যন্ত করতে পারেন।

গলগন্ডের কারন নির্ধারিত হবার পর এর চিকিৎসা পদ্ধতি টিক করা হয়। গলগন্ডের রোগীর থাইরয়েড গ্রন্থি যদি সামান্য একটু স্ফীত হয়ে থাকে এবং এর শুধুমাত্র পর্যাপ্ত আয়োডিন সরবরাহ করেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিছু যদি আয়োডিনের ঘাটতি জনিত হাইপোথারয়েডের গলগন্ড বৃহদাকার হয়।

তবে শুধুমাত্র আয়োডিনের অভাব পূরণ করে তেমন কোন উন্নতি আশা করা যাবে না। এক্ষেত্রে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত থাইরয়েড গ্রন্থিকে অপারেশন করে বাদ দেয়া ছাড়া গত্যান্তর থাকে না। এরই সাথে হরমোন খাওয়াতে হয় আজীবন। আর হাইপার থাইরয়েডিজমের কারণে গলগন্ড হলে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা কমাতে পারে এমন ওজন দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করা হয়।

এদের ক্ষেত্রেও অপারেশন করে স্ফীত গ্রন্থিটি বাদ দেয়া জরুরী হয়ে পড়ে অনেক অসময়। নিরীহ থাইরয়েড নড্যুল ওষুধ সংশোধনের চেষ্টা করাই শ্রেয়। আর থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সার হলে দ্রুত অপারেশনকরে পুরোটা গ্রন্থি ফেলে দেয়া হয়। এর পর রেড়িড অ্যাকটিতে আয়োডিন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

ডাঃ শাহজাদা সেলিম
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা
ফোন- ০১৯১৯০০০০২২

email: selimshahjada@gmail.com

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*