ক্যালসিয়াম কেন খাবেন?

ডা. শাহজাদা সেলিম
বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ২৬ অক্টোবর, ২০১২:

আমরা প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য রাখি না। সেটা জ্ঞাতসারেও হতে পারে আবার অজ্ঞাতেও। কেউ কেউ আবার এ ব্যাপারে খুব একটা ভাবতেও আগ্রহী হন না। আর উঠতি বয়সী বা যৌবনের এলাকাতে বসবাসকারীরা তো আরো উদাসীন। আমি তামান্না নামে ৩০ বছর বয়সী একজন দায়িত্ববান নারীকে চিনি। তার আপাত দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য খুবই চমৎকার। তার ছোট মেয়েটি মাতৃস্তন্য পান করছে এখনও। তার তেমন কোনো রোগের উপসর্গ নেই। তাকে ক্যালসিয়াম খাবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলাতে তিনি বেশ আপত্তি তুললেন এবং এটি গ্রহণে তার মতো স্বাস্থ্যবতী (!) নারীর কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে তা তিনি মানতে রাজি নন। এ রকম মনোভাব নিয়ে অনেক সচেতন ও শিক্ষিত নারীকে জীবন-যাপন করতে দেখেছি। তারা অনেকে ক্যালসিয়ামের অভাবে ভুগছেন। আর যখন তারা ক্যালসিয়াম গ্রহণে আগ্রহী হন, তখন বেশ অপরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।

এখানে ক্যালসিয়াম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

দেহে ক্যালসিয়ামের কার্যকারিতা

* হাড় মজবুত করে।

* পেশির সংকোচন এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকলাপ ঠিক রাখে।

* রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

* হরমোন নি:সরণ ও দেহের বিভিন্ন রকম কোষের বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

* দেহের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না এবং কোথাও কেটে বা ছিঁড়ে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।

* রসায়নিক দূষণ থেকে দেহকে রক্ষা করে। ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া থেকে দেহকে বাঁচাতে ক্যালসিয়াম অন্যতম উপাদান। বিশেষত যাঁরা কলকারখানায় কর্মরত বা শিল্প এলাকায় বসবাস করেন। ঢাকার মতো যেসব শহরে হাওয়া বিপুল পরিমাণ সিসা ঘুরে বেড়ায়, সেসব শহরের মানুষের নিয়মিত ক্যালসিয়াম খাওয়া প্রয়োজন।

* অগ্ন্যাশয়ের বিটা শেষে ইনসুলিন ভরতে সাহায্য করে ফলে ডায়াবেটিস এবং এর কারণে চোখ, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ত্বকের সমস্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখুন

দেহের ভেতরে ক্যালশিয়ামের মূল আবাস হল হাড় ও দাঁত। একই সঙ্গে রক্তেও কিছু পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। কেননা, এখান থেকেই শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্যালসিয়াম বণ্টন হয়।। রক্তে ক্যালশিয়ামের মাত্রা কমে শরীরের চাহিদা মেটাতে হাড়ে সঞ্চিত ক্যালসিয়াম রক্তে আসতে থাকে যার ফলে হাঁড় ক্ষয় শুরু হয়। রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে হাড় ও দাঁত মজবুত থাকে।

মেয়েদের বেশি করে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হয়

* অস্থিতে ক্যালসিয়ামের সমতা বজায় রাখে হরমোন। হরমোনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তারতম্যের জন্য ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বেশি করে হয়।

* খনিজ পদার্থ ও কোষ-কলা অন্থির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ দু’উপাদানের উৎপত্তি এবং ক্ষয়ের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় হরমোন ও ভিটামিন ডি দ্বারা।

* জন্মবিরতিকরণ বড়ি ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণ হতে পারে। তাই এসব বড়ি খাবারর বড়িও নিয়মিত খেয়ে যাওয়া উচিত।

*অন্থি ক্ষয় ও অন্থি তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য হানি ঘটার কারণেই অস্টিও পোরোসিসের সূত্রপাত হয়। ফলে সামান্য আঘাতেই হাড়ে চিড় ধরা, হাড় ভাঙা থেকে শুরু করে একেবারে চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এত নি:শব্দে এর আগমন ঘটে যে, আমরা বুঝতেই পারি না আমাদের ক্যালসিয়াম ঘাটতির কথা।

ওষুধ ও ক্যালশিয়াম ঘাটতি

* অ্যান্টসিড, অবসাদ কমাবার ওষুধ, ইপিলেন্সির ওষুদ, বেদনানাশক কিছু কিছু ক্ষেত্রে থেকে ক্যালশিয়ামের ঘাটতি দেকা দিতে পারে।

* মানসিক অবসাদ ও ডিচপ্রশনে ভুগছেন এমন অনেকের ক্ষেত্রেই দেকা যায় যে ক্যালশিয়ামের অভাবে ভুগছেন তিনি।

* উচ্চ রক্তচাপ ও অন্ত্রির ক্যান্সার দেখা দিতে পারে ক্যালসিয়ামের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে।

* একজিমা জাতীয় চর্মরোগ, মানসিক অন্থিরতা, অল্পতেই মেজাজ বিগড়ে যাওয়া, ভঙ্গুর নখ, মাংশ পেশির খিঁচ ধরা ইত্যাদি ক্ষেত্র বিশেষে ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণ দেখা দেয়।

ক্যালসিয়াম ও খাদ্যাভ্যাস

নিয়মিত বেশি পরিমাণে প্রাণিজ আমিষ ও স্নেহ জাতীয় খাদ্য ডায়েটারি ফ্যাট। রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। প্রাণিজ আমিষ শরীরে প্রচুর ফসফো উৎপন্ন করে যা ফলশ্র“তিতে প্রস্রাবের সঙ্গে ক্যালসিয়ামকে বের করে দেয়। বিশেষভাবে তৈরি ও সংরক্ষণ করা খাদ্যদ্রব্য ও একই কাজ করে।

* সমীক্ষায় দেখা গেছে, পঞ্চাশোর্ধ বয়সে যাঁরা নিরামিষ খান, আমিষ ভোজীদের জের তাদের দেহে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ভালো থাকে।

* অন্ত্রে ক্যালসিয়াম আত্তীকরণে বাঁধা দেয় অ্যালুমিনিয়াম, অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট, বেকিং পাউডার, চা, টুথপেস্ট, বিট লবণ থেকে অ্যালুমিনিয়াম আমাদের দেহে প্রবেশ করে। তাই এসব পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করাই শ্রেয়। অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ব্যবহার করা উচিত নয়।

* সোডা ও কোমল পানীয়ে খাবেন, চিনি ও ফসফেট থাকে যা ক্যালসিয়াম আত্মীকরণে বাঁধার সৃষ্টি করে। এরা দেহে ক্যালসিয়ামের ব্যবহারেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
* দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যে ক্যালসিয়াম আছে। তবে এরই সঙ্গে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবারও খাওয়া উচিত। কেননা প্রাণিজ খাদ্য হিসেবে দুধেও ফসফরাস থাকে বা ফসফেট তৈরি তাই দুধ ও অন্যান্য খাবারের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা উচিত।

ক্যালসিয়ামের উৎস

মিলিগ্রাম/প্রতি ১০০ গ্রামে
মাছ মাংস ও অন্যান্য শষ্যদানা
বাছা মাছ -৫২০
বেলে মাছ -৩৭০ গরুর মাংস Ñ ১০ চাল -১০
ভেটকি মাছ -৪৮০ ডিম (হাঁসের) -৭০ ময়দা -৪১
চেলা মাছের শুটকি-৩৫৯০ ডিম (মুরগির) -৬০ আটা -৪৮
কাতলা মাছ -৫৩০ রমুরগীর মাংশ -২৫ শিমাই -২২
মাগুর মাছ -১৮০৪ খাসির মাংশ -১২ সুজি -১৩
খৈলশা মাছ -৪৬০ খাসির কলিজা -১৭ চিড়া -২০
কই মাছ -৪১০ ভেড়ার মাংশ -১৫০ সুরি -২৩
চিংড়ি -৩২৩ গরুর দুধ -১২০ ছোলা -২০২
পুঁটি মাছ ১১০ ছাগলের দুধ -১৭০ মাষ কলাই -১৫৪
রুই মাছ -৬৫০ দই -১৪৯ মশুর ডাল -৭৫
চিংড়ির শুটকি -৪৩৮৪ সন্দেশ ০২০৮ মুগ ডাল -৭৫
শিং মাছ -৬৭০ পায়েশ -৩৮৮ চিনি -১২
টেংরা মাছ -২৭০ পান -২৩০ রুটি -১১

শাক সবজি ফল/মসলা
লাউ শাক-৮০ পুঁই শাক-১৬৪ সিম বিচি-৬০ পেয়ারা-২০ তেঁতুল-১৭০
কচু শাক-৪৬০ পাট শাক-১১৩ ঢেঁড়শ-১১৬ আম-১৬ আপেল-৫৬
লেটু শাক-৫০ ডাঁটা শাক-৮০ বরবটি-৩৩ ডাব-১৫ আমলকি-৩৪
সরিষার পাতা-১৫৫ মুলা শাক-২৮ ঝিংগা-১৬ কাঁঠাল-২৬ বেল-৩৮
লাল শাক-৩৭৪ ধনে পাতা-১৮৪ কাঁচা পেঁপে-১৩ কালো জাম-২২ বড়ই-১১
কলমি শাক-১০৭ গাজর-২৭ কাঁচা টমেটো-২০ পেঁপে-৩১ লিচু-৯০
কাঁচা মরিচ-১১ সিম-২১০ বেগুন-১১ আমড়া-৫৫ রসুন-৩০
বাঁধাকপি-৩১ করল্লা-২৩ কমলা-৪০ পিয়াজ-১০৪০
কলা-১৩ জিরা-১০৪০
হলুদ-১৫০

কতটা ক্যালসিয়ামপ্রয়োজন

১০-৩০ বছর বয়সীদের দৈনিক ১০০০-২০০০ মিলিগ্রাম
১০ বছরের কম এবং ৩০ বছরের বেশি বয়ষ্কদের দৈনিক ৮০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম প্রয়োজন। রজঃনিবৃত্ত মহিলা ও যারা হরমোন প্রতিস্থাপন বিশ্রামে ছিল তাদের প্রতিদিন ১৫০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম প্রয়োজন হয়।

গর্ভধারণ ও সন্তানকে স্তন্যদানের সময় প্রত্যেহ ১৫০০ থেকে ২০০গ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম খাওয়ানো প্রয়োজন।

দৈনিক ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে শরীরে ক্যালশিয়ামের ঘাটতি দেখা দিবে। স্বাভাবিকভাবে নিয়মিত সুষম খাদ্য খেলে শরীরের ক্যালশিয়ামের চাহিদা মিটে যায়। বাইরে থেকে ক্যালসিয়াম দেবার প্রয়োজন পড়ে না। বেড়ে উঠার সময় অর্থাৎ ১৫ বা ৩০ বছর পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয়।

সব ক্যালসিয়ামই এক নয়

বাজার থেকে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট কেনার সময় তাতে কি আছে তা দেখে নিন। ক্যালসিয়াম আরোটেট, ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট এবং ক্যালসিয়াম সাইট্রেট সবচেয়ে ভাল। এর প্রায় ৪০% ক্যালসিয়াম দেহে আত্তীকৃত হয়। ক্যালসিয়ামের কার্বোনেট ততটা কার্যকর নয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের জন্য ক্যালসিয়াম কার্বোনেট কোনো কাজেই আসে না।

সতর্কতা
কিডনির সমস্যা, কিডনি বা মূত্রাশয়ে পাথর থাকলে ক্যালসিয়াম বড়ি খাবেন না।
কোষ্ঠকাঠিন্য ও জনশূন্যতায় ভুগলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যালসিয়াম খাবেন না।
ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম যৌথভাবে কাজ করে। তাই ক্যালসিয়াম বেশি গ্রহণ করলে ম্যাগনেশিয়ামের চাহিদা বেড়ে আর এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ডা. শাহজাদা সেলিম
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।
ফোন ঃ ০১৯১৯০০০০২২

email: selimshahjada@gmail.com

Comments

  1. mehbub says:

    স্যার আপনার লেখাটি আমাদের সাস্থ্য বিষয়ক ব্লগ http://healths1.com/ এ প্রকাশ করলাম । আপনার সমস্ত DETAILS সহ প্রকাশ করলাম । ভূল হলে ক্ষমা করবেন ।

  2. খুব ভাল লাগল উপকারি একটি তথ্য পেয়ে ।

mehbub শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

*


*