হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোক থেকে পরিত্রাণ পেতে করণীয়

বিজনেসটাইমস২৪.কম
ঢাকা, ৩০ অক্টোবর, ২০১২:

উন্নত বিশ্বে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হার্ট অ্যাটাকের রোগী উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন এবং মস্তিষ্কের স্ট্রোক রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা থাকলেও স্ট্রোকের ফলে শতকরা ৬০% রোগী মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব বরণ করে। হার্টঅ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোকের মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ।

ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি শারীরিক সমস্যা ও ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি উপাদান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোক থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় অন্তত তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের অবদান স্বীকৃত

১। ধূমপান ও তামাকের বিবিধ ব্যবহার।

২। স্বাস্থ্য অনুপযোগী খাদ্য খাওয়া।

৩। শারীরিক পরিশ্রম না করা।

উল্লিখিত মূল তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের জন্য নিম্নোক্ত তিনটি শারীরিক সমস্যার উদ্ভব হয়Ñ

১। উচ্চ রক্তচাপ।

২। ডায়াবেটিস (রক্তে অধিক শর্করা)।

৩। রক্তে চর্বির আধিক্য।

আর এই তিনটি শারীরিক সমস্যা হলো হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকের জন্য প্রধান ঝুঁকিসম্পন্ন অবস্থা বা পরিস্থিতি। উন্নত দেশগুলোতে ধূমপানের পরিমাণ কিছুটা কমে এলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের বহুবিধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্থিক সচ্ছলতার সঙ্গে সঙ্গে অনেক উন্নয়নশীল দেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর শরীরের ওজন বেড়ে যাচ্ছে। কায়িক পরিশ্রমবিমুখতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খাদ্যে শর্করা ও চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক কথায় শরীরের ওজন বৃদ্ধি ও বয়সকালীন ডায়াবেটিস (টাইপ-২ ডায়াবেটিস) একরকম মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দুই দশক আগে চীন দেশের জনসাধারণের হার্টঅ্যাটাকের অবস্থান অসুখগুলোর ৫ম অবস্থানে ছিল অর্থাৎ (৬%) কিন্তু বর্তমান তা বৃদ্ধি পেয়ে অসুস্থতার ১ম স্থানে উন্নীত হয়েছে, যা ২৭%। আধুনিক চীনে ফাস্টফুড কালচার ও বিলাসবহুল জীবনযাপনই এ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। ইদানীং চর্বি ও লবণ সমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়া, ব্যাপক ফাস্ট ফুডের ব্যবহার ও বিলাস জীবনযাপনকেই এজন্য গবেষকরা দায়ী করছেন।

 ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলোর ক্ষতিকর অবদান

তামাক : তামাক শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। তামাকে ক্ষতিকারক পদার্থগুলো রক্তনালী ও ফুসফুসের ক্ষত সৃষ্টি করে। তাই অধিক তামাক ব্যবহার হার্টঅ্যাটাক, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের বৃদ্ধি ঘটায়। তামাক ভ্রƒণ ও শিশুর ক্ষতি করে। অন্যের তামাকের ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে প্রবেশ করলেও একই ক্ষতি করে। সে জন্য তামাকমুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে প্রকৃত সাফল্য অর্জন সম্ভব। সব রকমের তামাক পরিহার করলে কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং বছরান্তে তামাকবিহীন অবস্থার পর্যায়ে উন্নীত হওয়া সম্ভব হয়।

 স্বাস্থ্য অনুপযোগী খাদ্য খাওয়া

অসম খাদ্য বলতে বোঝায় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ (অতিরিক্ত ক্যালরি), অধিক চর্বি, শর্করা ও লবণ, অপর্যাপ্ত ফল ও সবজি গ্রহণ।

অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ তারই সাজে যিনি অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। শারীরিক পরিশ্রম কম অথচ অধিক খাদ্য গ্রহণ ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী। অধিক ওজন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টারলের (রক্তে চর্বির আধিক্য) বৃদ্ধি ঘটায়। এরূপ অবস্থার বৃদ্ধি ঘটতে ঘটতে শরীরের কেন্দ্রে অর্থাৎ পেট ও পেটের চারপাশে মেদ জমাই হলো হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকের জন্য সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিত। অসম খাদ্য বলতে ফাস্টফুড জাতীয় খাবার, যার সঙ্গে আবার অধিক চর্বি, লবণ ও শর্করা রয়েছে। শর্করানির্ভর বিভিন্ন ‘কোমল পানীয়’ নিত্যই ক্ষতি করছে অনেক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি এমনিতে বৃদ্ধি পায়, তবে অনিয়মিত খাদ্য খাবার ও অত্যধিক ওজন অল্প বয়সে ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রমের অবদান

এক কথায় শারীরিক পরিশ্রমবিমুখতা হার্টএটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি করে। পরিশ্রম শর্করা ও চর্বিকে পুড়ে (বার্ন) ফেলে ও ওজন সঠিক রাখতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে আনে। শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ায় ও দুঃশ্চিন্তা কমায়। হৃদ মাংসপেশি ও হাড়গুলোকে শক্তিশালী করে। রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে ও মাংসপেশি সতেজ রাখে।

এছাড়াও অন্যান্য অসুস্থতা এমনকি ক্যান্সারের সম্ভাবনাকে কমায়। পরিশ্রমক্ষম মানুষ সাধারণত বেশি আনন্দঘন জীবন যাপন করতে পারেন। ভাল নিদ্রা, শক্তিমত্তা, মনোযোগী ও প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। শারীরিক পরিশ্রম বলতে অতিমাত্রায় পরিশ্রমী হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট জোরে হাঁটা, মাঝারি পরিশ্রমের খেলাধুলা বা বাগান বা বাড়ির কাজ করা হার্টএটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমাতে পারে।

উচ্চরক্তচাপ : উচ্চরক্তচাপ মানেই রক্ত শিরার গায়ে জোরে আঘাত আর এজন্য হৃৎপিণ্ডের বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং শেষে হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। উচ্চরক্তচাপ মানেই হার্টএটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি। এসব ঝুঁকি কমাতে শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রয়োজন। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং ফলমূল ও সবজি বেশি পরিমাণে কিন্তু লবণ কম খেতে হবে। রক্তচাপ স্বাভাবিক অর্থাৎ ১২০ বা ৮০ মিলিমিটার পারদ রাখার জন্য প্রয়োজনে অল্প ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। কম মাত্রায় বেশি পরিমাণ না খেয়ে বেশি মাত্রায় কম করে ঘন ঘন অর্থাৎ প্রত্যহ ৫/৬ বার খাবার গ্রহণ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।

ডায়াবেটিস (রক্তে শর্করার আধিক্য) : শরীরে ইনসুলিন নামক হরমোন শরীরের কোষগুলোতে শর্করার শক্তিকে ব্যবহারের ব্যবস্থা করে। কোন কারণে শরীরে যদি প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি না হয় তবেই শর্করা অর্থাৎ সুগার রক্তেই থেকে যায়। তাই ডায়বেটিস হিসাবে ধরা পড়ে। রক্তে বেশি শর্করা মানেই রক্তনালিতে বাঁধা ও রক্ত জমাটের আশঙ্কা এবং সেই সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ বা অধিক ওজন বা ধূমপান হার্টএটাক, কিডনি, রোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার ইত্যাদির সম্ভাবনাকে অনেক গুণ বৃদ্ধি করে। সেই জন্য নিয়মমাফিক জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও চিকিৎসকের পরামর্শ একান্তই প্রয়োজন।

রক্তে চর্বির আধিক্য (উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল) : রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি মানেই মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। বেশি চর্বি রক্তনালিকে সরু ও শক্ত করে ফেলে, পরিণতিতে হার্টএটাক বা স্ট্রোক। রক্তনালিতে চর্বি কমানোর জন্য কম চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার বিকল্প নেই তবে বিশেষ করে পশুচর্বি; কিন্তু মাছের তেল আবার অনেকাংশে উপকারী। ওজন কমানো, পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলতে হবে। মনে রাখতে হবে অধিক ভাত ও আলু খাওয়ার ফলে অধিক চর্বি (ট্রাইগ্লিসারয়েড কোলেস্টেরল) এমনিতেই বেশি থাকে, যা কমানো জরুরি। একাধিক ঝুঁকি একত্রে হলে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। শরীরের মধ্যভাগে মেদ জমা ও সেই সঙ্গে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, চর্বি বা শর্করার আধিক্য, পরিশ্রমে অনীহা, দুঃশ্চিন্তা, ধূমপান, অধিক মদ্যপান ইত্যাদি সমন্বয়ে ‘মেটাবোলিক সিনড্রোম’ বা ঝুঁকিগুলোর সমন্বয় অসুস্থতা তথা মৃত্যুর হাতছানি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে। নিজস্ব উপলব্ধি ও উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শমতো জীবন নির্বাহ একান্তই জরুরি হয়ে পড়ে।

প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, শেরে বাংলানগর, ঢাকায় যোগাযোগ করতে পারেন।

বিশ্ব উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমিত রোগগুলো কমে এলেও অসংক্রমিত অসুস্থতা বেড়ে চলছে। হার্টএটাক, স্ট্রোক, দুর্ঘটনা, কিডনি রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি অসংক্রমিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও উপাদান কাজ করে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও উপাদান সনাক্ত করা ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হলো সময়ের দাবি। তাই বিশ্বব্যাপী আধুনিক এই মহামারী হার্টঅ্যাটাক, স্ট্রোক ও মেটাবোলিক সিনড্রোম সম্পর্কে জানতে ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এখনই তৎপর হতে হবে।

ডা. শাহজাদা সেলিম
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।
ফোন ঃ ০১৯১৯০০০০২২
email: selimshahjada@gmail.com

মন্তব্য প্রদান করুন

*


*